মাহমুদ মীর
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সহস্র শহীদের আত্মত্যাগ ও কোটি জনতার লড়াইকে সার্থক করতে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
দেশকে সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদের হিংস্র থাবা, শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত করার গভীরতম আন্দোলন এমূহুর্তে শুরু করার মতো দল গোষ্ঠী এবং প্রজ্ঞাসম্পন্ন নেতা, দল, গোষ্ঠী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, অনুপস্থিত। তবে তা গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে।
৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে প্রগতিশীল নেতারা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল স্বৈরাচার, দমন-পীড়ন, দুর্নীতি, বৈষম্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত গণবিস্ফোরণ। এই গণ-অভ্যুত্থানের মূল শক্তি ছিল দেশের ছাত্র-যুবক, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।
বাস্তবে সেই গণ-আন্দোলনে প্রকাশিত মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ধামাচাপা দিয়ে কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী দেশকে বিপথে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছে। এই কুচক্রী মহলের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার প্রত্যয় কোন কোন রাজিতিক দলের নেতৃবৃন্দ বারংবার উচ্চারণ করে আসছেন।
নেতারা বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষ চেয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, ধর্ম ও জাতি নির্বিশেষে মানবিক মর্যাদা, নারীর অধিকার, আইনের শাসন, ন্যায় বিচার, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, বৈষম্যহীন সমাজ এবং জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও যার বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে জনগণের সেই প্রত্যাশা উপেক্ষিত হয়েছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য, বাজারমুখী নীতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের কাছে জাতীয় সম্পদ ও স্বার্থ বিপন্ন করা, দুর্নীতি ও জনস্বার্থবিরোধী নানা সিদ্ধান্তে কারণে মানুষের জীবন আজ ক্রমেই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে।
বিভিন্ন দলের নেতারা ৫ আগস্ট বারবার বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। এটি সমগ্র জনগণের সংগ্রামের ইতিহাস। এই ইতিহাসকে যারা দলীয় সংকীর্ণতা, রাজনৈতিক বিভাজন বা ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়, তাদের প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত সব শহীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আহতদের যথাযথ চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের সকলকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
নেতৃবৃন্দ বলেন, শাসক গোষ্ঠী চায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা স্মরণসভার বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখতে। জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান হবে এমন বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে জনগণ হবে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত মালিক, রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, মানুষের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার সুরক্ষা পাবে। যার ধারাবাহিকতায় একদিন বৈষম্য ও শোষণের অবসান হবে।
এই আন্দোলনের উৎপত্তি হয়েছিল রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, ভোটাধিকার হরণ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণে ক্ষুব্ধ তরুণ-তরুণীদের মধ্য থেকে। শিক্ষার্থী, বেকার যুবক, চাকরিজীবী, রাজনৈতিক কর্মী, পথচারী—সবার হৃদয়ে তখন একটি একক আগুন জ্বলছিল: বাংলাদেশে মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে।
আমরা গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ্য করছি—কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি নিজেদের এই আন্দোলনের “একক উদ্যোক্তা”, “প্রধান চালিকাশক্তি” কিংবা “আসল মালিক” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করছে। বিশেষ করে, কোনো কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা ছাত্রজোট এমনভাবে বক্তব্য রাখছে যেন এই আন্দোলন শুধু তাদের মাধ্যমেই সংগঠিত হয়েছিল, অন্যদের কোনো ভূমিকা ছিল না। কেউ কেউ তো আবার “এনসিপি জুলাই অভ্যুত্থানের একমাত্র দাবিদার” হিসেবে নিজেদের প্রচার করতে শুরু করেছে।
এ ধরনের মনোভাব শুধু বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং ইতিহাসের প্রতি চরম অন্যায়।
আন্দোলন কখনোই একক নেতৃত্বের মালিকানা হতে পারে না। ইতিহাস বলে, কোনো গণআন্দোলন কখনো একক সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতায় টিকে থাকতে পারে না। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত প্রতিরোধ আন্দোলনের মূলেই ছিল বহু সংগঠন, বহু চিন্তা, বহু চেতনার সম্মিলিত স্রোতধারা।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানও এই ঐতিহাসিক ধারার বাইরে কিছু না। এর প্রাণ ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট, স্কুলছাত্র, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী, ডিজিটাল মিডিয়ায় সক্রিয় প্রবাসী বাংলাদেশি যুবক-তরুণ, এমনকি অনেক আওয়ামী লীগের নির্যাতিত ও বঞ্চিত কর্মী, অরাজনৈতিক তরুণও এই আন্দোলনের অংশ ছিলেন।
তাঁরা মিছিলে ছিলেন, পুলিশের লাঠির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, পোস্টার ছাপিয়েছিলেন, ফেসবুক লাইভে সত্য প্রকাশ করেছিলেন।
১. জুলাই আন্দোলনের মালিকানা জনগণের। এটি কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তি নিজের নামে চালাতে পারে না।
২. আন্দোলনের ইতিহাস যেন বিকৃত না হয়। সব সংগঠন, অংশগ্রহণকারী, শহীদ এবং নিপীড়িতদের সমান স্বীকৃতি দিতে হবে।
৩. ভবিষ্যতের সংগ্রামের জন্য শিক্ষা নিতে হবে এই অভ্যুত্থান থেকে। কে বেশি গলা ফাটালো সেটা বড় কথা নয়—কে কার পাশে দাঁড়িয়েছে, কে ঝুঁকি নিয়েছে, সেটাই বিচার্য।
৪. ঐক্যের আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। আন্দোলনকে পুঁজি করে কারো স্বার্থসিদ্ধি চলবে না।
জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান কোনো একক নায়ক বা সংগঠনের তৈরি গল্প নয়। এটি জনতার, এটি গণমানুষের, এটি তরুণ প্রজন্মের এক বিশাল আত্মত্যাগের দলিল।




