ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeজাতীয়ডিএসসিসির নওয়াব ইউসুফ মার্কেট মৃত্যু–ফাঁদে পরিণত

ডিএসসিসির নওয়াব ইউসুফ মার্কেট মৃত্যু–ফাঁদে পরিণত

মোঃ জহিরুল ইসলাম : রাজধানীর পুরান ঢাকার নয়াবাজার ব্রিজসংলগ্ন ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) মালিকানাধীন নওয়াব ‘ইউসুফ মার্কেট (ডিআইটি)’ বর্তমানে একটি জীবন্ত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালে মার্কেটের ছয়টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যবহারের অযোগ্য ঘোষণার পরও দুই বছরে সংস্কারের নামে এক টাকার কাজও হয়নি। বরং সিটি কর্পোরেশন এখানকার ৪২০ দোকান থেকে প্রতি মাসে ২০ লাখ টাকার বেশি ভাড়া তোলা অব্যাহত রেখেছে। এছাড়াও অবৈধ বাজার থেকে প্রতিদিন ৫৫ হাজার টাকা করে ইজারার নামে টাকা তোলা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ—লাখ লাখ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও তাদের জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ডিএসসিসি সম্পূর্ণ উদাসীন।

সরেজমিন দেখা যায়, ১ থেকে ২য় তলা পর্যন্ত ছয়টি ভবনে মোট ৪২০টি দোকান। প্লাস্টিক ও কার্টুন কারখানা, গোডাউন, ব্যাগের দোকান, হার্ডওয়্যার, মুদিখানা, খাবার হোটেল, ফ্লাইউড ও মসলার দোকানসহ প্রতিদিন হাজারো মানুষের ভিড়। ভবনের মাঝের সরু শাড়িতে আরও প্রায় ৪০০ কাঁচাবাজার ও মাছের দোকান রয়েছে। প্রতিটি ভবনের গায়ে বড় ফাটল, ধসে পড়া দেওয়াল, ভেঙে যাওয়া সিঁড়ি, পিলার থেকে বের হওয়া রড, এলোমেলো বৈদ্যুতিক তার এবং চারদিকে আবর্জনার স্তূপ—সব মিলিয়ে মার্কেটটি যেন টিকে আছে কেবল ভাগ্যের ওপর। স্থানীয়রা সোজাসাপটা মন্তব্য করেছেন—“ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটা মার্কেট।”

সাম্প্রতিক ২১ নভেম্বরের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। ভূমিকম্পের পর মার্কেটে ছুটে আসা মোহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, “বাবা এখানে চাকরি করেন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয় নিয়ে ছুটে আসি। দোকানের ভেতর–বাইরেও আগেই ফাটল ছিল, ভূমিকম্পের পর আরও নতুন ফাটল দেখি। ছাদ, সিঁড়ি, পিলার—সব জায়গায় গর্ত। পুরো মার্কেটটা এখন বস্তির মতো।”

এ সময় এলাকায় থাকা শিশু হৃদয় ও ফাহাদ ভয় পেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“ভূমিকম্পের সময় সবাই দৌড়াদৌড়ি করছিল। খুব ভয় পেয়েছিলাম।”

দোতলার ব্যাগের দোকানের কর্মচারী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “তিন বছর আগে ভবনটাকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন থেকে সংস্কারের কথা শুনে আসছি—কিন্তু কিছুই হয়নি। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে আরও নতুন ফাটল ধরেছে। এখানে যেকোনো মুহূর্তে ভবন ভেঙে পড়তে পারে। পেটের দায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই আমাদের কাজ করতে হয়।”

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাদের ভাষায়, “৪২০ দোকান থেকে মাসে ৪ হাজার ৯০০ টাকা করে ভাড়া তোলা হয়—মাসে দাঁড়ায় ২০ লাখ টাকার বেশি। ট্রেড লাইসেন্স বাবদ আরও ৫ হাজার টাকা দিতে হয়। তারপরও ৩০ বছরে একদিনও সংস্কার হয়নি। তাহলে কোটি টাকা কোথায় যায়?”

মিতালী হার্ডওয়্যার-এর ৫০ বছরের ব্যবসায়ী মো. ফিরোজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সিটি কর্পোরেশন কোটি টাকা তোলে, কিন্তু একটি ইটও লাগায়নি। ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেও আমাদের দোকান ছাড়তে বলে না। অযোগ্য ভবনে আমাদের রেখে ভাড়া নেওয়াটা সরাসরি প্রতারণা। বিদ্যুতের বিলও বণিক সমিতি আলাদাভাবে নিচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, “এই মার্কেটে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। চার–পাঁচ হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। বড় ভূমিকম্প হলে একজনও বাঁচবে না। অনেক গেট বন্ধ থাকে, বের হওয়ার পথই নেই। ভবনের অবস্থা দেখে মনে হয়—ভূমিকম্প ছাড়াই ধসে পড়তে পারে। সিটি কর্পোরেশন দ্রুত আমাদের অস্থায়ীভাবে অন্যত্র জায়গা দিয়ে ভবনটি আধুনিক করে পুনর্নির্মাণ করুক।”

ব্যবসায়ীরা আরো জানান, ৫ আগস্টের পর এলাকায় কোনো জনপ্রতিনিধি না থাকায় বিষয়টি আরও অবহেলায় পড়েছে। তাদের দাবি—“অস্থায়ীভাবে আমাদের পুনর্বাসন করে মার্কেটটি বহুতল করে পুনর্নির্মাণ করতে হবে।”

অন্যদিকে, বণিক সমিতির সভাপতি মোঃ আজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ—তিনি অবৈধভাবে আলাদা বিদ্যুৎ লাইন দিয়েছেন। কিন্তু বিষয়টি জানতে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি প্রত্যেকবারই ফোন কেটে দেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জহিরুল ইসলাম বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। গতকাল–আজ মিটিং হয়েছে। পরিত্যক্ত ভবনগুলো কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে—তা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই মার্কেট নিয়েও আলোচনা হবে।”

ডিএসসিসির প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. জয়নুল আবেদীন যুগান্তরকে বলেন, “মার্কেটটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার প্রস্তাব আছে, তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ব্যবসায়ীরা দোকান ব্যবহার করায় ভাড়াও নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি এখনো অফিসিয়ালি প্রসেসে নেই।

১৫ দিনের মধ্যে কমিটি জানাবে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ কি না। ঝুঁকিপূর্ণ ও অযোগ্য ঘোষণা হলে ভাড়া নেওয়া যাবে না। তখন সিটি কর্পোরেশনকে নতুন ভবন করে আগের দোকানদারদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।”

এই পরিস্থিতিতে এলাকাবাসীর হতাশা স্পষ্ট। তারা বলেন, “একদিন যদি পুরো বাজারটা মাথায় ভেঙে পড়ে, তখন সবার চোখ খুলবে। কিন্তু তখন কি মানুষের জীবন ফেরত আসবে?”

পুরান ঢাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা নওয়াব ইউসুফ মার্কেট আজ একটি ভয়ংকর ঝুঁকির প্রতীক—যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবন বাজি রেখে ব্যবসা করছে, আর সিটি কর্পোরেশন ভাড়া তুললেও কোনো দায়িত্ব নিচ্ছে না।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular