নিউজ ডেস্ক : আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো এবং নির্বাচনে অভ্যন্তরীণ বিভেদ এড়াতে নতুন কৌশলে এগোচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও প্রার্থী সমর্থনের ক্ষেত্রে যাতে একাধিক পক্ষ তৈরি না হয়, সে জন্য ‘একক প্রার্থী’ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে দলটির হাইকমান্ড।
দলীয় সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি মূল দল এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। সাংগঠনিক স্থবিরতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নেতৃত্বের দুর্বলতা কাটিয়ে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় নেতৃত্ব গড়ে তোলাই এই পুনর্বিন্যাসের অন্যতম লক্ষ্য।
একক প্রার্থী নিয়ে কৌশল
বিএনপির পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও তৃণমূলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন প্রার্থীকে সমর্থন করা। অর্থাৎ, নির্বাচনে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীরা কোনো একজন প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারেন।
দলের অভ্যন্তরে অতীতের নির্বাচনী অভিজ্ঞতাকেও এবার গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একাধিক প্রার্থী বা বিদ্রোহী প্রার্থীকে ঘিরে তৃণমূলে যে বিভক্তি তৈরি হয়েছিল, ভবিষ্যৎ স্থানীয় নির্বাচনে তার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই আগেভাগে সমন্বয় তৈরির চেষ্টা চলছে।
তৃণমূল থেকেই প্রার্থী বাছাই
বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের বদলে তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এলাকায় জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক ভূমিকা, জনসম্পৃক্ততা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী নির্ধারণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
দলটির নেতারা মনে করছেন, স্থানীয় নির্বাচনে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে—এমন গ্রহণযোগ্য নেতাদের সামনে আনতে পারলে ভোটের মাঠে সাংগঠনিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্যও বজায় রাখা যাবে।
কমিটি পুনর্গঠনে সতর্কতা
নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও বিএনপি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। দ্রুত সাংগঠনিক কার্যক্রম শেষ করতে গিয়ে যাতে বিতর্কিত ব্যক্তি কিংবা অন্য রাজনৈতিক দলের অনুপ্রবেশকারী নেতৃত্বে চলে না আসেন, সে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
পাশাপাশি তুলনামূলক তরুণ, সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের সাংগঠনিক দায়িত্বে নিয়ে আসার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় থাকা সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে দলটির।
তারেক রহমানের নির্দেশনা
তৃণমূল পুনর্গঠনের এই প্রক্রিয়ায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে গুলশানে রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সাংগঠনিক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত যেসব সাংগঠনিক প্রক্রিয়া ঝুলে রয়েছে, সেগুলো সম্পন্ন করে দলকে আরও গতিশীল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সামনে স্থানীয় নির্বাচন
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির এই প্রস্তুতি মূলত সংগঠনকে মাঠপর্যায়ে আরও সুসংগঠিত করার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী যেন একাধিক পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুর্বল হয়ে না পড়েন, সেটিই এখন দলটির অন্যতম বিবেচনা।
তবে প্রার্থী মনোনয়ন বা সমর্থনের ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতাদের মতামত কতটা কার্যকর হবে এবং একক প্রার্থী নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হবে—তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণ ও তৃণমূলের ঐকমত্যের ওপর।-
সব মিলিয়ে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিএনপি শুধু নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখছে না; বরং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে তৃণমূলকে নতুন করে সক্রিয় করার একটি সুযোগ হিসেবেও বিবেচনা করছে। একক প্রার্থী, তৃণমূলের মতামত এবং নতুন নেতৃত্ব—এই তিন বিষয়কে সামনে রেখেই দলটি নির্বাচনী প্রস্তুতিতে এগোতে চাইছে।




