সম্রাট মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। জেন্ডার সমতায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষস্থানীয়। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রাখতে নারীদের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। কেবল দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যেক নারীর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানকে সদা সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন দেশে গমনেচ্ছু নারীদের ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন পুলিশকে সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হয়। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ হিসেবে ইমিগ্রেশন পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব কেবল পাসপোর্ট ও ভিসার পাতা উল্টে সিল মারা নয়; বরং প্রতিটি নাগরিকের প্রস্থান ও নিরাপদে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সব ধরনের ঝুঁকি নিরূপণ করাও তাদের আইনি ও নৈতিক দায়িত্বের অপরিহার্য অংশ।
সম্প্রতি তিন তরুণীকে নেপাল যাত্রায় ইমিগ্রেশন পুলিশের বাধা এবং এ বিষয়ে হাইকোর্টের রুল জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ওই তিন নারী একটি কনফারেন্সে অংশ নিতে নেপাল যেতে চাইলে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাদের যাত্রা স্থগিত করে। কনফারেন্সে যাওয়ার উপযুক্ত নথিপত্র উপস্থাপন করতে বলা হলে তারা তা দেখাতে পারেননি। কোথায়, কখন এবং কোন বিষয়ে কনফারেন্স—সেটিও তারা সঠিকভাবে বলতে পারেননি। তারা শিক্ষার্থী হিসেবে কোথায় পড়াশোনা করেন এবং কোথায় চাকরি করেন, সে সম্পর্কেও সঠিক তথ্য উপস্থাপন করতে পারেননি। এমনকি ভ্রমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কেও তারা অসত্য তথ্য দিয়েছেন বলে জানা যায়।
তাদের যাত্রা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় মানবপাচারের ঝুঁকি এড়াতে এবং তাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই যাত্রা স্থগিত করা হয়। সাধারণ দৃষ্টিতে একে নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বা জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুদ্রার অন্য পিঠে রয়েছে এক রূঢ় বাস্তবতা ও ভয়াবহ অপরাধজগতের ছায়া।
আমাদের সামাজিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় মানবপাচার, বিশেষ করে নারীপাচার, একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। গোয়েন্দা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রগুলো বাংলাদেশ থেকে নারীদের মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের জন্য নেপাল, ভারত বা দুবাইকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। পাশাপাশি চীনে ট্যুরিস্ট ও কিউ-ওয়ান ভিসার আড়ালে পাচারের শিকার হওয়া নারীদের ক্রন্দন- আহাজারির বিভিন্ন প্রতিবেদন সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত।
এসব চক্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তু সাধারণত তরুণী ও একা ভ্রমণকারী নারীরা। তাদের বিদেশে নেওয়ার জন্য ‘ট্যুরিস্ট ভিসা’ বা ‘আকর্ষণীয় চাকরির’ প্রলোভন দেখানো হয়। ইমিগ্রেশন ডেস্কে কয়েক মিনিটের কথোপকথনের মধ্যেই একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে একজন যাত্রীর সার্বিক প্রোফাইল যাচাই করতে হয়। যাত্রীর ভ্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য, স্পনসরের সত্যতা, গন্তব্যে থাকার ব্যবস্থা বা আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে যদি ‘যৌক্তিক সন্দেহ’ তৈরি হয়, তাহলে ওই নাগরিককে সম্ভাব্য বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা ইমিগ্রেশন পুলিশের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। এটি কোনোভাবেই লিঙ্গবৈষম্য নয়; বরং সম্ভাব্য ভিকটিম শনাক্তকরণ বা ‘ভিকটিম প্রোফাইলিং’-এর অংশ।
ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ৩৮ হাজার ৪৮০ জন যাত্রী নেপালে গেছেন। এর মধ্যে ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও ৩ হাজার ৪০৮ জন যাত্রী বাংলাদেশে ফিরে আসেননি। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ৬৭৭ জন পুরুষ এবং ৭৩১ জন নারী। নেপালকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে চীন, মালয়েশিয়া, মিসর ও ইতালিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবপাচারের একটি হাব গড়ে উঠেছে বলে জানা যায়। এ বিষয়ে নেপালে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস চিঠির মাধ্যমে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে।
আমরা প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে দেখি, সাধারণ ট্যুরিস্ট ভিসার আড়ালে বিদেশে গিয়ে অসংখ্য নারী ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিসহ বিভিন্ন ধরনের অমানবিক ও অবৈধ কাজে লিপ্ত করা হয়। এসব অসহায় নারীকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা বাংলাদেশ দূতাবাস এবং রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল ও কূটনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জিং একটি প্রক্রিয়া। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখলে ইমিগ্রেশন পুলিশের ভূমিকাকে নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ মনে হলেও, এটি মূলত মানবপাচার প্রতিরোধের সর্বশেষ রক্ষাকবচ। কারণ একবার কোন নাগরিক ইমিগ্রেশনের ফাইনাল চেকিং অতিক্রম করে বিমানে উঠে বসলে তার নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টিও আওতার বাইরে চলে যায়।
BRAC Migration Programme-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ৬৭ হাজার ১৯৯ জন বাংলাদেশি নারী বিদেশ থেকে দেশে ফিরে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন। এর পাশাপাশি মজুরি না দেওয়া, খাদ্যবঞ্চনা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, জোরপূর্বক শ্রম, দেশে যোগাযোগ করতে না দেওয়া এবং জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তির মতো বিষয়ও এর মধ্যে রয়েছে। তবে এই সংখ্যাকে মোট সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কারণ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শোষণের শিকার নারীরা নিজের ও পরিবারের মান-সম্মানের কথা বিবেচনা করে এসব ঘটনা রিপোর্ট করেন না।
হাইকোর্টের রুল আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের দিকটি স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয়। সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার রয়েছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক কেবল ‘নারী’ বা ‘অবিবাহিত’ হওয়ার কারণে বিদেশে যেতে পারবেন না—এমন কোনো বিধান বাংলাদেশে নেই। ইমিগ্রেশন পুলিশও এ বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। কারণ, বাংলাদেশের যেকোনো বিমানবন্দর বা স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগে দায়িত্ব পালনের আগে কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
নেপালগামী তিন নারী যাত্রীর মিথ্যা তথ্য দিয়ে ইমিগ্রেশন অতিক্রমের চেষ্টা যেমন তাঁদের নিজেদের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বা বিপদের আশঙ্কা তৈরি করে, তেমনি এটি রাষ্ট্রের জন্যও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক রুটে নারীর নিরাপদ গমনাগমন নিশ্চিত করতে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ বা ঝুঁকি নিরূপণ পদ্ধতি রয়েছে। এর ভিত্তিতেই মানবপাচারের ঝুঁকি থেকে নারীদের রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
ব্যক্তিস্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। একই সঙ্গে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। তাই নারীর বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। যথাযথ যাচাই, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং ঝুঁকিভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে এই ভারসাম্য নিশ্চিত করা সম্ভব।
লেখক: সাবেক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক




