ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeতথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানপদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প

মীর মাহমুদ আলী

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট দূর করা এবং মৃতপ্রায় নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি অন্যতম প্রধান অবকাঠামোগত উদ্যোগ।

বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা নদীর ওপর নতুন একটি ব্যারাজ নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। মেগা এই প্রকল্পটি আগামী সাত বছরে নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।

বুধবার ঢাকার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

‘পদ্মা ব্যারাজ’ নামের এই উন্নয়ন কর্মসূচির প্রাথমিক লক্ষ্য দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৃতপ্রায় পাঁচটি নদী পুনর্জীবিত করা।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীগুলোর আশপাশের ২৪টি জেলার পানিসংকট নিরসন হবে, যার ফলে প্রায় সাত কোটি মানুষ উপকৃত হবে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি।

ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে শুষ্ক মৌসুমে ওই অঞ্চলে ব্যাপক খরা পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং পদ্মা নদীর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য নদী শুকিয়ে যায়। এর ফলে নদী তীরবর্তী এলাকায় লবণাক্ততা দেখা দেয়।

অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতাও তৈরি হয় বলে জানান মন্ত্রী।

“সবদিক বিবেচনায় এই প্রকল্পটিকে আমরা বলছি যে মাস্টারমাইন্ড প্রকল্প, যেটা আমাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, ইশতেহারে ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান নির্বাচনের পূর্বে রাজশাহীতে গিয়ে জনসাধারণের সামনে সেটা বক্তব্য রেখেছিলেন, কমিটমেন্ট (অঙ্গীকার) করেছিলেন। সেটা বাস্তবায়নের জন্য এই প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়েছে,” বুধবার একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের বলেন মি. এ্যানি।

আগামী অর্থবছরেই প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

ড্যাম বা বাঁধের ও ব্যারাজ এর মধ্যে পার্থক্য: বাঁধের মাধ্যমে জলাধারের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গাজুড়ে পানি ধরে রাখা হয়। অন্যদিকে, ব্যারাজের মাধ্যমে পানির প্রবাহ বন্ধ করার পরিবর্তে সেটির গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এক্ষেত্রে মূল অবকাঠামোতে একাধিক দরজা রাখা হয়, যেখান দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়।

মূল তথ্যসমূহ

• অবস্থান: রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলা এবং পাবনা জেলা সংলগ্ন পদ্মা নদী।
• প্রস্তাবিত দৈর্ঘ্য: ২.১ কিলোমিটার (৬,৯০০ ফুট), যেখানে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং ২টি ফিশ পাস থাকার পরিকল্পনা রয়েছে।
• ব্যয় ও অর্থায়ন: প্রথম পর্যায়ের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪,৪৯৭.২৫ কোটি টাকা (সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত)।
• সময়কাল: ২০২৬ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
• ধারণক্ষমতা: ১২ মিটার উচ্চতায় প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার (বা ২.৯ বিলিয়ন ঘনমিটার) পানি সংরক্ষণ ক্ষমতা থাকবে।
• বিদ্যুৎ উৎপাদন: প্রকল্প থেকে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

সম্ভাব্য সুবিধা ও লক্ষ্য

• নদী পুনরুজ্জীবন: গড়াই-মধুমতি, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বারাল ও ইছামতীর মতো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৃতপ্রায় প্রধান নদীগুলোর প্রবাহ ও নাব্য ফিরিয়ে আনা।
• সেচ ও কৃষি: প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান এবং অতিরিক্ত লাখ লাখ টন ধান ও মাছ উৎপাদনে সহায়তা।
• লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ: শুষ্ক মৌসুমে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়িয়ে দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও খালে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ রোধ করা।
• উপকৃত অঞ্চল: রাজশাহী, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের ১৯ থেকে ২৪টি জেলার প্রায় ৬.৫ থেকে ৭ কোটি মানুষ এর সুফল পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঝুঁকি ও সমালোচনা

পদ্মা নদীর ওপর নতুন ব্যারাজ নির্মাণের সরকারি সিদ্ধান্ত দেশে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকার বলছে, এই প্রকল্প দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করবে, লবণাক্ততা কমাবে, সেচব্যবস্থা উন্নত করবে ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে। কিন্তু পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞদের অনেকেই সতর্ক করছেন, এই ব্যারাজই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য বড় পরিবেশগত ও ভূ-প্রাকৃতিক সংকট ডেকে আনতে পারে।

• পলি জমার সমস্যা: উজানের পানির অনিশ্চয়তা এবং ভারী পলি জমার কারণে ব্যারাজের কার্যকারিতা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

• ‘সেডিমেন্ট-স্টার্ভড’: বাংলাদেশের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপ টিকে থাকার জন্য প্রতিবছর প্রায় ১০০ কোটি টন পলি প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার পানি বিশেষজ্ঞ ড. মো. খালেকুজ্জামান বলেন, বর্তমানে গঙ্গা নদী প্রতিবছর প্রায় ৪০ থেকে ৬০ কোটি টন পলি বাংলাদেশে বয়ে আনে। কিন্তু ব্যারাজের কপাট দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এই পলি উজানেই আটকে যাবে।

এর ফলে ভাটিতে প্রবাহিত পানি হয়ে উঠবে ‘সেডিমেন্ট-স্টার্ভড’ বা পলিশূন্য ক্ষুধার্ত পানি, যা নদীর পাড় মারাত্মকভাবে ভাঙতে পারে। একই সঙ্গে মেঘনা মোহনায় মিঠাপানির চাপ কমে গেলে সমুদ্রের নোনা পানি আরও গভীরে, এমনকি উত্তর-পূর্বের নিচু হাওর অঞ্চল পর্যন্ত ঢুকে পড়তে পারে।

• বন্যা ও নদীভাঙন: ব্যারাজের উজানে ১৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় প্লাবন ও তীব্র নদীভাঙন বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ব্যারাজের পেছনে পলি জমে নদীর তলদেশ দ্রুত ভরাট হবে। এতে পাংশা থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও ভয়াবহ বন্যা তৈরি হতে পারে। ফারাক্কা বাঁধের উজানে ভারতের বিহার ও মালদা অঞ্চলে ইতোমধ্যে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

• পরিবেশগত প্রভাব: ভাটিতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া এবং জলজ জীববৈচিত্র্য ও সুন্দরবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি নিয়ে পরিবেশবিদ ও নদী গবেষকরা সমালোচনা করেছেন।

প্রকল্পে যে পরিমাণ সেচের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তার জন্য প্রয়োজনীয় পানিও ব্যারাজে জমা হবে না। ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দিতে অন্তত ৯ দশমিক ৫ থেকে ২৬ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি লাগবে, অথচ ব্যারাজে সংরক্ষিত পানির পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ঘনমিটার।

এছাড়া সব পানি সেচে ব্যবহার হলে নদীপথে নৌ-চলাচল ও মাছের জন্য পর্যাপ্ত পানি থাকবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য পুরো পদ্মা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঝুঁকিতে ফেলাও যুক্তিযুক্ত নয়।

• মাছের প্রজনন: আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো মাছের প্রজনন। বিশেষ করে ইলিশসহ বহু দেশীয় মাছের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। প্রকল্পে দুটি ফিশ ল্যাডার রাখার কথা বলা হলেও বাংলাদেশের নদীর মাছ এগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবে—এমন প্রমাণ নেই।

লেখক: CEO, Mass Information Research

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular