সুমন দত্ত: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিনানশিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড বন্ধ করে দেবার সিদ্ধান্ত নিলে প্রতিষ্ঠানটির আমানতকারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। আমানতকারীরা সরকারের কাছে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ না করার দাবি জানিয়েছে।
সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫) জাতীয় প্রেসক্লাবে আমানকারীদের পক্ষ এ দাবি জানান আতিকুর রহমান আতিক। তিনি আমানতকারীদের পক্ষে গড়ে তোলা সংগঠন পিপলস লিজিং এন্ড ফিনানসিয়াল কাউন্সিলের সভাপতি ও প্রধান সমম্বয়কারী।
আতিকুর রহমান আতিক বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলে হাজার হাজার আমানতকারী তাদের কষ্টার্জিত অর্থ থেকে বঞ্চিত হবেন এবং প্রকৃত লুটেরারা পার পেয়ে যাবে।
আমানতকারীদের অভিযোগ, অর্থ ফেরতের অনিশ্চয়তায় এখন পর্যন্ত ৩৫ জন আমানতকারী মারা গেছেন।
অবসায়ন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার পর কিছু অর্থ ফেরত পেলেও আবারও বন্ধের উদ্যোগে আমানতকারীরা গভীর সংকটে পড়েছেন। চালু কম্পানিকে বন্ধ করা অন্যায়। বন্ধ হলে হাজার হাজার আমানতকারী একেবারেই অসহায় হয়ে পড়বেন। এটি হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যর্থতা এবং তাদের ওপরই এর পূর্ণ দায় বর্তাবে।
আমানতকারীদের সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিক বলেন, ‘আমানতকারীরা দীর্ঘদিন ধরে চরম অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর নির্ভর করেই অনেক অবসরপ্রাপ্ত মানুষ সংসার চালাতেন, চিকিৎসা করাতেন ও সন্তানের পড়াশোনা চালাতেন। কিন্তু ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনে হাইকোর্ট কম্পানিটিকে লিকুইডেশনে পাঠালে সবকিছু থেমে যায়। অর্থের অভাবে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ জন আমানতকারী মৃত্যুবরণ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে তৎকালীন মালিক-পরিচালকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে পিপলস লিজিং থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে। পরে ২০২১ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে কম্পানিটি পুনরায় চালু হলে ধীরে ধীরে আমানতকারীরা তাদের অর্থ ফেরত পেতে শুরু করেন। আদালতের নির্দেশে নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার আমানতকারীকে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করেছে, ডিফল্টারদের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা উদ্ধার করেছে এবং শেয়ারবাজারে কম্পানিটিকে তালিকাভুক্ত করেছে।
এ ছাড়া হাইকোর্ট সম্প্রতি চারজন সাবেক পরিচালককে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে এই অর্থ আদায় করা গেলে বাকি আমানতকারীরাও তাদের প্রাপ্য ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন বলে আশাবাদ প্রকাশ করা হয়।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি পিপলস লিজিং পুনরায় বন্ধ বা লিকুইডেশনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর আমানতকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে তারা প্রশ্ন তোলেন—চালু অবস্থায় একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেন বন্ধ করতে চাইছে বাংলাদেশ ব্যাংক? এর পেছনে কার স্বার্থ জড়িত?
আমানতকারীরা বলেন, যদি পিপলস লিজিং আবারও বন্ধ করে দেওয়া হয় তবে প্রকৃত দোষীরা ও ঋণখেলাপিরা পার পেয়ে যাবে, আর সাধারণ আমানতকারীরা নিঃস্ব হয়ে যাবে। এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।
তারা সরকারের কাছে জোর দাবি জানান, পিপলস লিজিং থেকে লুট হওয়া অর্থ দেশ-বিদেশ থেকে পুনরুদ্ধার করে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আদায় নিশ্চিত করতে হবে এবং সব আমানতকারীকে সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দিতে হবে।
উলেখ্য, অনিয়ম, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার কারণে ধুঁকতে থাকা ৯টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে না পারা, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি—এই তিন সূচক ধরে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘অপরিচালনযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের লাইসেন্স বাতিল করার প্রক্রিয়া চলছে।



