ঢাকা  বৃহস্পতিবার, ১১ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅপরাধবাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে অনিয়ম

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে অনিয়ম

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক বিএসএমএমইউ)-এর বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বহু যোগ্য প্রার্থীকে উপেক্ষা করে বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোজাম্মেল হক তার ব্যক্তিগত পছন্দের একজন অযোগ্য প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল—সহযোগী অধ্যাপক পদে আবেদনকারীর অন্তত তিন বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে অথবা নূন্যতম চার বছর অন্যান্য স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানে সহকারী অধ্যাপক পদে সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অথচ অনুসন্ধানে জানা গেছে, আলোচিত প্রার্থী ডা. মিলিভা মোজাফফর ২০১৭ সালে রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং ২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান, যা ২০২২ সালের ১০ মে কলেজের গভর্নিং বডি অনুমোদন করে। সেই অনুযায়ী তিনি সহযোগী অধ্যাপক পদের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম চার বছর সহকারী অধ্যাপক নিয়মিত পদে চাকুরীর শর্ত পূরণ করেননি। তবুও তার আবেদনপত্রে তিনি নিজেকে ২০১৭ সাল থেকেই সহকারী অধ্যাপক হিসেবে উল্লেখ করে মিথ্যা তথ্য প্রদান করেছেন। এই ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাকে ২৭ মে ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত নিয়োগ বোর্ডে সাক্ষাৎকারের জন্য নির্বাচিত করা হয়, যদিও অনেক যোগ্য প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ডা. মিলিভা মোজাফফরের নিজ হাতে পূরণকৃত আবেদনপত্রের কপি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির অনুলিপি, ও তার মেডিকেল কলেজ হতে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার সনদপত্র অনুসন্ধানকারী টিমের হাতে এসেছে। জানা গেছে সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোজাম্মেল হক নিয়োগ বোর্ডে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ডা. মিলিভা মোজাফফরকে নির্বাচিত করেন। পরে তার মিথ্যা তথ্য প্রদান সংক্রান্ত বিষয়টি জানাজানি হলে অধ্যাপক মোজাম্মেল তাকে দ্রুত নিয়োগপত্র দেওয়ার জন্য প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়োগপত্র স্থগিত রাখে এবং অধ্যাপক মোজাম্মেল হককে অন্তর্ভুক্ত করে একটি তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে। জানা গেছে, ডা. মিলিভা মোজাফফরের স্বামী বগুড়া মেডিকেল কলেজের একটি ছাত্র সংগঠনের সাবেক সভাপতি। তার সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ রাজনৈতিক দলের চিকিৎসক নেতারা তদন্ত কমিটির কার্যক্রম প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগে নিয়মিত রাজনৈতিক মহড়া দিচ্ছেন, যা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

এছাড়াও, ডা. মিলিভা মোজাফফরের বিরুদ্ধে ভুয়া গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ, গবেষণার তথ্য জালিইয়াতি এবং অন্যদের গবেষণা থিসিস ব্যবহার করে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আরো অভিযোগ রয়েছে, অধ্যাপক মোজাম্মেল হক নিজেও তদন্ত কমিটিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন এবং ডা. মিলিভা মোজাফফরের ভুয়া তথ্য প্রদানের বিষয়টিকে উপেক্ষা করে ২০২০ সাল থেকে তার লেকচারার গ্রেডে সহকারী অধ্যাপক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালনের মেয়াদকে ‘নিয়মিত পদে চাকরি’ হিসেবে দেখিয়ে বৈধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চলতি দায়িত্ব ও অতিরিক্ত দায়িত্ব নীতিমালা ২০২৩ অনুযায়ী, চলতি দায়িত্বের চাকরিকে পদোন্নতি বা নিয়মিত পদে চাকরি হিসেবে পরিগনিত হয় না। একই নিয়মে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালাতেও নিয়মিত পদে চাকুরীর শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। প্রচলিত নিয়মে দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে বহু শিক্ষক বর্তমানে চলতি দায়িত্বে সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত থাকলেও, তারা নিয়মিত পদে চাকরির শর্ত পূরণ না করায় উচ্চ পদে পদোন্নতির জন্য যোগ্য বিবেচিত হন না। অথচ অধ্যাপক মোজাম্মেল হক এসব নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত পছন্দের প্রার্থীকে বৈধতা দিতে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে চরম অস্বস্তির সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনে মিথ্যা তথ্য প্রদান শাস্তিযোগ্য অপরাধ ও আবেদনপত্র সরাসরি বাতিলযোগ্য।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অধ্যাপক মোজাম্মেল হক ২০২৪ সালের নভেম্বরে অবসর-উত্তর ছুটিতে গেলেও এখনো নিয়মিতভাবে বিভাগে অফিস করছেন, নিজের কক্ষ দখলে রেখেছেন এবং বিভাগীয় কার্যক্রমে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন। বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের ল্যাব ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় তার একক প্রভাব রয়েছে। ভবিষ্যতেও এই প্রভাব বজায় রাখার উদ্দেশ্যে তিনি ডা. মিলিভা মোজাফফরকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চাপ অব্যাহত রেখেছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা এ ধরনের অনিয়মের দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এই বিষয়ে আরো জানার জন্য অধ্যাপক মোজাম্মেল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং রেজিস্ট্রারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।

ঢাকা নিউজ/এস 

 

 

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular