প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এমন কিছু ছবি ও সংবাদ ভাইরাল হতে দেখা যায়, যেখানে সমাজের প্রতিষ্ঠিত, ধনী, প্রভাবশালী কিংবা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বয়স্ক ব্যক্তিদের সঙ্গে অল্পবয়সী তরুণী বা বালিকার বিয়ের খবর প্রকাশ পায়।
সভ্য সমাজে বিবাহের মূল ভিত্তি
নৈতিক এবং মানবিক আলোচনার বিষয়: যদিও প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের আইনসম্মতভাবে বিবাহের অধিকার রয়েছে, তবুও যখন দুই পক্ষের বয়স, সামাজিক অবস্থান, অভিজ্ঞতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে বিশাল ব্যবধান থাকে, তখন বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি একটি সামাজিক, নৈতিক এবং মানবিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
স্বাধীন সম্মতি এবং দায়িত্ববোধ: একটি সভ্য সমাজে বিবাহের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সমতা, স্বাধীন সম্মতি এবং দায়িত্ববোধ।
বিয়ের ন্যূনতম নির্ধারিত বয়স: বাংলাদেশের আইনে নারী ও পুরুষের বিয়ের ন্যূনতম বয়স নির্ধারিত রয়েছে। আইন ভঙ্গ করে যদি কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা শুধু আইনগত অপরাধই নয়, বরং শিশুর অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। অন্যদিকে, যদি উভয় পক্ষই আইনগতভাবে প্রাপ্তবয়স্ক হন, তবে বিয়েটি বৈধ হতে পারে। কিন্তু বৈধতা আর নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা সব সময় এক জিনিস নয়। সমাজকে সেই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি বোঝার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
ক্ষতিকর প্রবণতা: আজকের বাস্তবতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক সময় এমন ঘটনাকে রোমান্টিক বা প্রশংসনীয় হিসেবে উপস্থাপন করে। আবার অন্যদিকে, যাচাই-বাছাই ছাড়াই ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্রূপ এবং অপমানের সংস্কৃতিও তৈরি হয়। উভয় প্রবণতাই ক্ষতিকর। আমাদের উচিত ব্যক্তি নয়, বরং সেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করা, যা বারবার এমন অসম বয়সের সম্পর্ককে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি: সমাজের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেন। তাই তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও অনেক সময় সামাজিক প্রভাব ফেলে। যদি সমাজে এমন ধারণা তৈরি হয় যে অর্থ, ক্ষমতা বা সামাজিক মর্যাদা থাকলেই যেকোনো বয়সের ব্যবধানকে সহজেই গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়, তবে তা নারী-পুরুষের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা: পরিবারেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ বা অন্য কোনো কারণে পরিবারের সদস্যরা এমন বিয়েতে সম্মতি দেন। কিন্তু একটি মেয়ের শিক্ষা, আত্মনির্ভরশীলতা, ব্যক্তিত্বের বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।
গণমাধ্যমের দায়িত্ব: কোনো ঘটনার সংবাদ পরিবেশন করতে হবে তথ্যভিত্তিকভাবে, অতিরঞ্জন বা ব্যক্তিগত অপমানের ভাষা ব্যবহার না করে। একই সঙ্গে আইন, নৈতিকতা, নারী অধিকার এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা উচিত।
পরিশেষে বলা যায়, একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজ গড়তে হলে বিবাহকে কেবল আনুষ্ঠানিক বৈধতার চোখে নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান, সমতা, স্বাধীন সম্মতি এবং মানবিক মূল্যবোধের আলোকে দেখতে হবে। বয়সের বড় ব্যবধানযুক্ত প্রতিটি বিবাহকে এক কাতারে ফেলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি সমাজে যদি এমন প্রবণতা ক্রমেই বাড়তে থাকে, তবে এর সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব নিয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তি আক্রমণ নয়, সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চাই হতে পারে একটি সুস্থ সমাজ গঠনের সবচেয়ে কার্যকর পথ।
লেখক- প্র্রাবন্ধিক, শিক্ষক




