ঢাকা  বুধবার, ২২শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ৭ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখেলা'মেচ্চি’ খুঁজতে গিয়ে আর্জেন্টিনা পেয়েছিল মেসিকে

‘মেচ্চি’ খুঁজতে গিয়ে আর্জেন্টিনা পেয়েছিল মেসিকে

ক্রীড়া ডেস্ক: একসময় আর্জেন্টিনার ফুটবল কর্তাদের কাছে তার নামটাও ঠিকমতো জানা ছিল না। রোজারিওর এক কিশোর তখন স্পেনে বসে নিজের ভাগ্য বদলের গল্প লিখছিল। তাকে দলে ভেড়াতে চাইছিল স্পেন। আর নিজের দেশ আর্জেন্টিনা তখন খুঁজছিল সেই ছেলেটিকেই, যার নামও তারা ভুল করে ফেলেছিল। সেই ‘মেচ্চি’ আজ লিওনেল মেসি।

আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকাদের একজন। বুধবার বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টালে বেনিনের বিপক্ষে শেষবারের মতো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে নামবেন তিনি। শেষ হবে দুই দশকেরও বেশি সময়ের এক আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। কিন্তু শেষ হবে না আর্জেন্টিনার সঙ্গে তার সম্পর্কের গল্প।

এই গল্পটা শুরু হয়েছিল ভালোবাসা দিয়ে নয়, বরং খোঁজাখুঁজি দিয়ে। কিশোর বয়সেই বার্সেলোনায় পাড়ি জমান মেসি। স্পেন তাকে নিজেদের জাতীয় দলে পাওয়ার চেষ্টা করছিল।

অথচ আর্জেন্টিনার ফুটবল কর্তাদের অনেকেই তখন জানতেনই না, তাদের দেশের রোজারিওর এক ছেলে ইউরোপে বসে কী বিস্ময় তৈরি করছে। আর্জেন্টাইন সাংবাদিক ও লেখক সার্জিও লেভিনস্কি, যিনি ‘মেসি অ্যান্ড এভরিথিং এলস’ বইটি লিখেছেন।

তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘মেসি এত বেশি ভিন্ন ভিন্ন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে যে, সেগুলোকে আসলে আলাদা আলাদা যুগই বলা যায়। শুরুতে জাতীয় দলের হয়ে তাকে প্রচণ্ড ভুগতে হয়েছে। সত্যিই তাকে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে।’

২০০৩ সালের অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে ফিনল্যান্ডে আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে ৩-২ গোলে হারিয়েছিল স্পেন। সেই ম্যাচের পর স্পেনের তরুণ খেলোয়াড় সেস্ক ফাব্রেগাস নাকি আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিদের বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাদের কাছে হেরেছ, কারণ তোমাদের সেরা খেলোয়াড় এখন বার্সেলোনায়। সে একজন জিনিয়াস।’

মজার ব্যাপার, ফাব্রেগাস তখন বার্সেলোনার লা মাসিয়ায় মেসিরই সতীর্থ। আর্জেন্টিনার যুব দলের কোচ হুগো টোকাল্লির স্মৃতিতেও এমনই এক ঘটনা আছে। সম্প্রতি তিনি জানান, স্পেনের দলের প্রধান রাঁধুনিও তাকে বলেছিলেন, টুর্নামেন্ট জিততে আর্জেন্টিনার এমন একজন ছেলেকে দরকার, যে বার্সেলোনায় খেলে।

কিন্তু সেই ছেলেটিকে খুঁজে বের করাটাই ছিল কঠিন কাজ। আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) কর্মকর্তা ওমর সাউতো রোজারিওর টেলিফোন ডিরেক্টরি ঘেঁটে স্পেনে মেসির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু ফোন করে তিনি খুঁজছিলেন ‘লিওনার্দো’ নামে একজনকে। উত্তরে তাকে বলা হয়, ‘তার নাম লিওনার্দো নয়, লিওনেল।’

ভুলটা সেখানেই শেষ হয়নি। মেসির পদবি নিয়েও বিভ্রান্ত ছিল এএফএ। লেভিনস্কির দাবি, বার্সেলোনায় পাঠানো এক ফ্যাক্সে মেসির নাম লেখা হয়েছিল ‘মেচ্চি’। কারণ কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, ছেলেটি হয়তো ইতালীয় বংশোদ্ভূত। আজ যে নামটি ফুটবল দুনিয়ায় সবচেয়ে পরিচিত, সেই নামটাই একসময় আর্জেন্টিনার ফুটবল কর্তাদের কাছে ছিল–এতটাই অচেনা।

২০০৪ সালে আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলেন মেসি। শুরু হয় নীল-সাদা জার্সিতে তার পথচলা। কিন্তু সংশয় তখনো কাটেনি।

২০০৫ সালের নেদারল্যান্ডস অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে মেসি ছিলেন বেঞ্চে। দেশের বাইরে বেড়ে ওঠা একজন কিশোরকে নিয়ে তখন ছিল প্রবল সন্দেহ। লেভিনস্কির ভাষায়, ‘দেশে না খেলা একটি ছেলেকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে প্রবল আপত্তি ছিল। স্পেনে থাকার কারণে তাকে বিদেশি হিসেবেও দেখা হতো।’

জাতীয় দলে নিজের ক্লাবের পারফরম্যান্সের ছাপ ফেলতে না পারায় সমালোচনাও শুনতে হয়েছে মেসিকে। কেউ কেউ তাকে ‘পেচো ফ্রিও’ বলে ডাকতেন। অর্থাৎ তার মধ্যে আবেগ নেই, লড়াইয়ের আগুন নেই।

২০১১ সালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের একটি ম্যাচ বদলে দেয় সেই সম্পর্কের মোড়। কঠিন পরিস্থিতিতে এক গোলে পিছিয়ে পড়েও মেসির নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ায় আর্জেন্টিনা।

সেই ম্যাচে ক্লান্তিতে মেসি বমিও করেছিলেন। তবু শেষ পর্যন্ত দলকে জিতিয়েছিলেন। লেভিনস্কির মতে, সেটিই ছিল সেই মুহূর্ত, যখন আর্জেন্টিনার সমর্থকরা মেসিকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করেন।

এরপর আসে ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল। চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে যাওয়ার পর অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। কিন্তু এবার তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়নি আর্জেন্টিনা। বরং গোটা দেশ তাকে ফিরে আসার অনুরোধ জানায়।

এরপর লিওনেল স্কালোনির যুগে বদলে যায় সবকিছু। মেসি হয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার অবিসংবাদিত নেতা। তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা জেতে দুটি কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ।

আরও পরিণত, আরও স্পষ্টভাষী এক অধিনায়ক হয়ে ওঠেন মেসি। তার নেতৃত্বের ধরন নিয়ে শুরু হয় ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা। ম্যারাডোনার মতো মেসির প্রতি আর্জেন্টিনার ভালোবাসা অবশ্য শুরু থেকেই তৈরি হয়নি। মেসির বেড়ে ওঠা, ক্যারিয়ার, সাফল্যের বড় অংশই কেটেছে দেশের বাইরে। ফলে তাকে ভালোবাসতে আর্জেন্টিনার সময় লেগেছে।

সেই ভালোবাসাই আজ এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মেসির বিদায় মানে শুধু একজন ফুটবলারের শেষ ম্যাচ নয়। আর্জেন্টিনার সঙ্গে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এক সম্পর্কের শেষ অধ্যায়।

যে ছেলেটির নাম একদিন ভুল করে ‘মেচ্চি’ লেখা হয়েছিল, বুধবার সেই মেসির নামেই মনুমেন্টালে গাইবে আর্জেন্টিনা। বুঝতে পারবে– কিছু ভালোবাসা শুরুতে তৈরি হয় না। সময়ের সঙ্গে জন্ম নেয়। তারপর একদিন সেই ভালোবাসাই বিদায়ের মুহূর্তকে সবচেয়ে বেশি কষ্টের করে তোলে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular