সুমন দত্ত: দেশের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে রেলওয়ের মহাপরিচালককে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর সংবাদ প্রকাশ করায় প্রতিবাদ জানিয়েছে রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি। সোমবার ৭ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতীয় প্রেসক্লাবের ২য় তলায় রেলওয়ে প্রশাসনিক কাঠামো ধ্বংস নয়, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি চাই, রেলওয়ে মহাপরিচালক ঘিরে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর প্রচারের প্রতিবাদে বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন।
বক্তরা বলেন, অডিট আপত্তি হলে অবশ্যই তার জবাবদিহি হতে হবে। নথি যাচাই হতে হবে। প্রয়োজন হলে তদন্ত হতে হবে।
ভুল বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির আগেই সেটিকে দুর্নীতির চূড়ান্ত রায় হিসেবে সংবাদে উপস্থাপন করা হলে জনগণের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। কারণ- অভিযোগ, অডিট আপত্তি এবং প্রমাণিত অপরাধ-একটি বিষয় নয়। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে। আমরা অনিয়মের বিরুদ্ধে। আমরা সরকারি অর্থের অপচয়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা বিশ্বাস করি- “প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী বানানো যাবে না ।’ যদি কোনো প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান করেন, আমরা সেটিকে স্বাগত জানাই। কিন্তু অনুসন্ধান যেন শুধু একটি অডিট আপত্তি বা একটি প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর না করে। নথি দেখুন। চুক্তি দেখুন। প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় দেখুন। সংশোধিত ব্যয় দেখুন। প্রকৃত ব্যয় দেখুন। কাজের পরিমাণ ও গুণগত মান যাচাইয়ের নথি দেখুন। বিল ভেটিংয়ের প্রক্রিয়া দেখুন।
অর্থ ছাড়ের অনুমোদন দেখুন। তারপর সিদ্ধান্তে আসুন। বিশেষ করে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প নিয়ে যে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের দাবি বিভিন্নভাবে সামনে এসেছে, সেই হিসাবের ভিত্তি জনগণের সামনে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন । প্রশ্ন- চুক্তিমূল্য, সংশোধিত প্রকল্প ব্যয় এবং প্রকৃত ব্যয়ের পার্থক্যকে যদি সরাসরি ‘অতিরিক্ত ব্যয়’ বলা হয়, তাহলে সেটি কি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে না? তাই আমরা চাই, এই হিসাব নিয়ে আবেগ নয়-নথি ও তথ্যের ভিত্তিতে সাংবাদিক অনুসন্ধান হোক। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে-একটি বড় রাষ্ট্রীয় প্রকল্প কখনো একজন ব্যক্তি একা পরিচালনা করেন না ।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের বিভিন্ন সময়ে একাধিক কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রশাসনিক নথি অনুযায়ী-এস. কে. চক্রবর্তী, সুকুমার ভৌমিক,গোলাম ফখরুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, মো. আফজাল হোসেন এবং বর্তমানে নাজনীন আরা কেয়া । বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন । যে সময়ে যে কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন, সেই সময়ের সিদ্ধান্ত ও ভূমিকা আলাদাভাবে অনুসন্ধান করুন । কে কাজের পরিমাণ যাচাই করেছেন? কে গুণগত মান প্রত্যয়ন করেছেন? কে বিল ভেটিং করেছেন? কে অনুমোদন দিয়েছেন? কোন নথির ভিত্তিতে অর্থ ছাড় হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর বের হলে প্রকৃত দায়ও পরিষ্কার হবে। শুধু একজনকে সামনে রেখে পুরো প্রকল্পের দায় নির্ধারণ করা সঠিক হবে না। আমরা কাউকে দায়মুক্তি দিতে চাই না। আবার কাউকে প্রমাণ ছাড়াও অভিযুক্ত করতে চাই না।
আমাদের অবস্থান খুবই সহজ- দোষী হলে ব্যবস্থা নিন। নির্দোষ হলে অপপ্রচার বন্ধ করুন। বর্তমান মহাপরিচালক প্রসঙ্গেও আমাদের অবস্থান একই। তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন। তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু শুধু অডিট আপত্তি, অভিযোগ কিংবা সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত ও নিষ্পত্তির আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলে সেটি শুধু একজন কর্মকর্তার বিষয় থাকে না-এটি প্রশাসনিক সংস্কৃতির বিষয় হয়ে দাঁড়ায় । “একজন কর্মকর্তা অনিয়মের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিলে তাঁর সিদ্ধান্তের জবাবদিহি হবে, নাকি তাঁকেই ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে পড়তে হবে?”
যদি কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ভুল হয়-তা যাচাই করুন। ভুল প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিন । কিন্তু প্রশাসনিক মতবিরোধ, স্বার্থের সংঘাত বা সিদ্ধান্তগত বিরোধ যেন ব্যক্তিগত অপপ্রচার ও চরিত্রহননের অসূত্রে পরিণত না হয়। একটি সংবাদ শুধু একজন কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে না; তার প্রভাব পড়ে তাঁর পরিবার, সহকর্মী এবং পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর। তাই আমাদের অনুরোধ-সংবাদ হোক তথ্যভিত্তিক, অনুসন্ধান হোক নিরপেক্ষ, এবং অভিযোগ হোক প্রমাণনির্ভর ।
রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাষ্ট্রের সেবা করেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্ত হবে। কিন্তু তদন্তের ফলাফল আসার আগেই যদি কাউকে প্রকাশ্যে দুর্নীতিবাজ বা অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে শুধু একজন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন না-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাহসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা এমন একটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি চাই না, যেখানে কর্মকর্তা মনে করবেন- “অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে আমার পদ নিরাপদ থাকবে না ।” কারণ তখন ব্যক্তি বদলাবে, চেয়ার বদলাবে-কিন্তু সমস্যার সমাধান হবে না।
আমাদের মূল কথা-ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ে কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা, ঠিকাদার, সিন্ডিকেট কিংবা কোনো স্বার্থগোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে জনগণের সম্পদ। রাষ্ট্রের সম্পদ। বাংলাদেশ রেলওয়ে আরও শক্তিশালী হোক, আরও নিরাপদ হোক, আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হোক-এটাই তাদের প্ৰত্যাশা ।




