সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সুন্দরবনের গভীরে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের হামলার শিকার হয়েছেন বাবলু গাজী (৪৮) নামের এক মৌয়াল। সহযাত্রীদের সাহসী প্রতিরোধে প্রাণে বাঁচলেও তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়েছে। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে বাঘের সঙ্গে লড়াই করে তাঁকে উদ্ধার করেন সঙ্গীরা। পরে দীর্ঘ সময় নৌপথে এনে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রোববার সকাল আটটার দিকে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের কাছিকাটা এলাকার পায়রাটুনি খালে এ ঘটনা ঘটে। প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর আজ সোমবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে তাঁকে লোকালয়ে আনা হয়। আহত বাবলু গাজী সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মালেক গাজীর ছেলে।
স্থানীয় ও বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকে বৈধ পাস নিয়ে ১১ সদস্যের একটি মৌয়াল দল সুন্দরবনে মধু সংগ্রহে যায়। দলে বাবলু গাজী ও তাঁর বাবা মালেক গাজীও ছিলেন। রোববার সকালে দলটি পায়রাটুনি খাল এলাকায় মধুর চাক খুঁজছিল। এ সময় বাবলু অন্যদের চেয়ে কিছুটা সামনে চলে যান। হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
মৌয়াল দলটির নেতা ইউসুফ গাজী বলেন, “বাঘটি বাবলুর ঘাড় ও শরীরের বিভিন্ন অংশ কামড়ে ধরে জঙ্গলের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখন আমরা সবাই চিৎকার দিয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে এগিয়ে যাই। কয়েকজন মিলে বাঘের দিকে আঘাত করতে থাকি। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে লড়াই চলে। পরে বাঘটি বাবলুকে ছেড়ে জঙ্গলের ভেতরে চলে যায়।”
গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে বনসংলগ্ন এলাকায় তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে নৌকাযোগে লোকালয়ে এনে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান শরিফুল ইসলাম বলেন, “রোগীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত রয়েছে। বিশেষ করে ঘাড়, পিঠ ও হাতে বাঘের থাবা ও কামড়ের চিহ্ন আছে। তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। তবে বর্তমানে তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল।”
আহতের বাবা মালেক গাজী বলেন, “ছেলেকে নিয়ে মধু ভাঙতে গেছিলাম। হঠাৎ বাঘ এসে ঝাঁপ দিছে। আমরা যদি সবাই মিলে এগিয়ে না যাই, তাহলে ওরে বাঁচানো যাইত না। এখন আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছে।”
সুন্দরবনে মধু সংগ্রহে যাওয়া মৌয়ালদের জীবনঝুঁকির কথা তুলে ধরে আরেক মৌয়াল আরাফাত গাজী বলেন, “প্রতিবার বনেতে গেলে পরিবার চিন্তায় থাকে। বাঘ, কুমির, সাপ—সব সময় মৃত্যুভয় নিয়ে কাজ করতে হয়। তারপরও পেটের দায়ে যেতে হয়।”
বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, “বাঘের আক্রমণে একজন মৌয়াল আহত হয়েছেন বলে আমরা জেনেছি। বন বিভাগ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। আহত ব্যক্তির চিকিৎসার বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ মৌসুম এলেই মৌয়ালদের বাঘের হামলার ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রতিবছরই কোনো না কোনো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। তবু জীবিকার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বনে যেতে হয় তাঁদের।
ঢাকানিউজ/নাজ/২৪




