ফরিদপুর প্রতিবেদক: ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে টাকা ছাড়া মেলে না ট্রলি। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকারের অভিযোগ রয়েছে রোগী ও স্বজনদের।
এমন অভিযোগের মধ্যেই ট্রলি না পেয়ে তিন বছর বয়সি এক মুমূর্ষু শিশুকে কোলে নিয়ে ছুটে চলার দৃশ্যের ভিডিও ঘিরে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। পরে সেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ট্রলি চাইলেও তাদের তা দেওয়া হয়নি এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রেও তারা অবহেলার অভিযোগ করেন।
জানা গেছে, সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয় সাফা মারওয়া (৩) নামে ফরিদপুর শহরতলির কানাইপুরের হোগলাকান্দি গ্রামের রবিন শেখের মেয়ে।
শিশুটিকে মুমূর্ষু অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরে ট্রমা বিভাগ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পাঠানো হয় প্রায় দুইশ মিটার দূরে অবস্থিত নতুন ভবনের পঞ্চম তলার সার্জারি বিভাগে।
সেখানে ট্রলি ছাড়া পায়ে হেঁটে নেওয়ার সময় ৩২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
ওই ভিডিওতে দেখা যায়, অক্সিজেন মাস্ক ও স্যালাইন দেওয়া অবস্থায় শিশুটিকে কোলে করে দৌড়াচ্ছেন এক ব্যক্তি (শিশুটির চাচা)। তার পেছনে আরেক ব্যক্তি (শিশুটির বাবা) অক্সিজেন সিলিন্ডার উঁচু করে দৌড়াচ্ছেন এবং এক নারী স্যালাইনের ব্যাগ হাত দিয়ে উঁচু করে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াচ্ছেন।
এমন দৃশ্যের ভিডিও আরজু মিয়া নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তে তা ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দাবি করা হয়, টাকা ছাড়া ট্রলি না দেওয়ায় শিশুটিকে স্বজনরা কোলে করে নিয়ে যাচ্ছেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেনরা প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য জুড়ে দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালে ভর্তির পরে শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নেওয়ার পথে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে শিশুটির মৃত্যু হয়। পরে স্বজনরা বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং রাত ১১টার দিকে শিশুটিকে দাফন করা হয়।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে শিশুটির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়-ছোট্ট একটি দোচালা টিনশেড ঘরে পরিবারটির বসবাস। পরিবারের সদস্য, স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম।
শিশুটির মা জুঁই বেগম জানান, সোমবার দুপুর ১২টার দিকে বাড়ি সংলগ্ন সড়কের পাশে খেলছিল সাফা। এ সময় রাস্তার একপাশ থেকে অন্যপাশে যাওয়ার সময় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা শিশুটিকে চাপা দেয়।
এতে শিশুটির চিৎকারে পরিবারের সদস্যরা ছুটে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। এ ঘটনায় শিশুটির একটি হাত ভেঙে যায় এবং মাথায় গুরুতর আঘাত পায় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
শিশুটির বাবা রবিন শেখ অভিযোগ করে বলেন, ট্রমা বিভাগ থেকে ব্যান্ডেজ শেষে সার্জারিতে পাঠানো হয়। তখন অক্সিজেন লাগানো ছিল। এ সময় একটা ট্রলি চেয়েছিলাম কিন্তু থাকতেও ট্রলি দেওয়া হয়নি। পরে আমার বড় ভাই বাচ্চাটাকে কোলে নেয় এবং আমি অক্সিজেন উঁচু করে দৌড়ায় গিয়েছিলাম।
কোলে করে নিতে গিয়ে ক্যানুলা খুলে যায় এবং মেয়ে আরও অসুস্থ হয়ে যায়। সার্জারি বিভাগে যাওয়ার পর নার্সদের ডাকলেও তারা আসেননি, আধাঘণ্টা পরে একজন এসে ক্যানুলা লাগিয়ে দেয়, ততক্ষণ স্যালাইন বন্ধ ছিল। এরপর একজন ডাক্তার এসে দ্রুত ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেন।
তিনি এই অবহেলার বিচার দাবি করে বলেন, আমার মেয়েটাকে বাঁচাতে পারলাম না। আমি চাই, মেডিকেলে আমার মতো অন্য কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন। এজন্য এই হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
এ বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদপুরের কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান বলেন, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত পরিচালক) মানষ কৃষ্ণ কুন্ডু বলেন, ভিডিওটি দেখেছি। পরে এ বিষয়ে খোঁজ নিয়েছি। মূলত, শিশুটির শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় ট্রলি দেওয়া হয়নি। ওই মুহূর্তে তাকে কোলে করে নেওয়াই উত্তম ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। এছাড়া হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ট্রলি আছে বলে দাবি করেন এবং টাকা দাবির বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।




