নিউজ ডেস্ক : ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারিকৃত একাধিক অধ্যাদেশ রাষ্ট্র সংস্কারের বদলে দায়মুক্তির ফাঁদ গড়ে তুলছে, নিয়ন্ত্রণ ও পুরনো আমলাতান্ত্রিক কৌশল ফের সক্রিয় হচ্ছে বলে তাদের আশঙ্কা। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ অভিযোগ এক সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন এবং জানান, জুলাই সনদের চেতনা বহু ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়েছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এসব কথা বলেন।
টিআইবি বিশেষত তিনটি কেন্দ্রীয় ক্ষেত্র, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশ কমিশন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এর সংস্কার অধ্যাদেশ বিশ্লেষণ করে বেশ কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দুদক সংস্কারে কমিশনার সংখ্যা বাড়ানো, নারী কমিশনার ও আইসিটি বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্তি এবং সরাসরি এফআইআর করার ক্ষমতা যোগ করার মতো ইতিবাচক দিক থাকলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়। ইন্টিগ্রিটি ইউনিট বাতিল করা ও পূর্ণ আর্থিক-প্রশাসনিক স্বাধীনতা না দেয়াকে টিআইবি গুরুতর দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরেছে। এছাড়া দুর্নীতির মামলায় জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সাজা মওকুফের বিধান রাখা হয়েছে, যা দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে, এমনটিই তাদের অভিযোগ।
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশকে টিআইবি ‘সংস্কার নয়, পুরনো ব্যবস্থার পুনর্বাসন’ বলেছে। অধ্যাদেশে সাবেক আমলা ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে; ‘সদস্য সচিব’ পদ সৃষ্টি এবং প্রথম তিন বছরে অনির্দিষ্ট সংখ্যক সরকারি কর্মকর্তাকে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে, এসবই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের লক্ষ্যকে সমস্যা হতে পারে বলে তারা মনে করেন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি)–র ক্ষেত্রে প্রাথমিক খসড়াটি আন্তর্জাতিক মানে সঙ্গত ছিল, তবে তাৎপর্যপূর্ণ সংশোধনের ফলে কমিশন স্বাধীনতা হ্রাস পেয়েছে বলে টিআইবি জানায়। বিশেষ করে কমিশনার নিয়োগে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
টিআইবির সতর্কতা অনুযায়ী, যদি এই অধ্যাদেশগুলো সংশোধন ছাড়া কার্যকর হয় তাহলে,
(১) দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচারের পথে বাধা সৃষ্টি হবে,
(২) তদন্ত-প্রক্রিয়া ও জবাবদিহি সয়ংক্রিয়ভাবে দুর্বল হবে, এবং
(৩) রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বাড়বে, ফলত ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ চর্চা হবে।
টিআইবি বলেছেন, সংস্কারের নামে এমন কাঠামো গড়লে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
টিআইবি অনুরোধ করেছেন- সরকার সংশ্লিষ্ট কমিশনগুলোর খসড়া পুনর্বিবেচনা করুক, গঠন প্রণালীতে স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করুক, এবং দন্ড বা জরিমানা-ভিত্তিক ‘মার্জিনিং’ অপশন বাদ দিয়ে কার্যকর তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করবে এমন ব্যবস্থাই গ্রহণ করুক। নীতিনির্ধারকদের প্রতি টিআইবি বলেছে, রাষ্ট্র সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য “স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা” ঐক্যমত্যে নিয়ে আসা ছাড়া কোনো অধ্যাদেশ অর্থপূর্ণ নয়।
বর্তমান সময়ে জনগণের প্রত্যাশা, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দর্শন অনুযায়ী গভীর ও টেকসই প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার।
সেই প্রত্যাশার প্রেক্ষিতে অধ্যাদেশগুলোর উপস্থাপনা ও বাস্তবায়ন যদি জনগণের আস্থা অর্জন করতে না পারে, তাতে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নাগরিক অসন্তোষ বাড়ারও প্রেক্ষাপট তৈরি হবে, টিআইবি তাই দ্রুত সংশোধন ও স্বচ্ছতা দাবি করছে।
টিআইবির সতর্কবার্তা রাষ্ট্র-সংস্কারের প্রক্রিয়াকে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ দেখায়। সংস্থাটি স্পষ্ট করে বলছে, রূপান্তর তখনই সফল হবে যখন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো খোলামেলাভাবে স্বচ্ছ, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক হবে। নীতিনির্ধারকরা যদি টিআইবির এই উদ্বেগগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে সংস্কার-অধ্যাদেশে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে দেন, তবেই রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে; নতুবা ‘দায়মুক্তির ফাঁদ’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হতে পারে।
ঢাকানিউজ২৪/মহফ




