ঢাকা  বুধবার, ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeউৎসব/দিবসইতিহাসের প্রথম কোরবানি

ইতিহাসের প্রথম কোরবানি

সৈয়দা নার্গিস

মুমিন মুুসলমানদের কিছুু ভুল ধারণা আছে কোরবানি মানেই পশু জবেহ করা। প্রকৃত অর্থে কোরবানি কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়, এটি মূলত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করার এক প্রাচীন ইবাদত।

ইসলামি শরিয়তে কোরবানির গুরুত্ব অপরিসীম। তবে এই বিধান কেবল নবি মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের জন্যই নয়, বরং আদম (আ.) থেকে শুরু করে প্রত্যেক জাতির জন্যই এটি নির্ধারিত ছিল।

পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বপ্রথম কোরবানি অনুষ্ঠিত হয় আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মাধ্যমে। তৎকালীন শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, একই গর্ভে জন্ম নেওয়া যমজ ভাই-বোনের মধ্যে বিবাহ হারাম ছিল, তবে অন্য গর্ভে জন্ম নেওয়া ভাই-বোনের সঙ্গে বিবাহ বৈধ ছিল। কাবিলের সহোদরা বোন আকলিমা অত্যন্ত সুন্দরী হওয়ায় কাবিল তাকেই বিয়ে করতে চাইল, যা ছিল শরিয়তবিরোধী। এই বিরোধ মেটাতে আদম (আ.) তাদের উভয়কে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি পেশ করার নির্দেশ দেন।

যার কোরবানি কবুল হবে, সে-ই আকলিমাকে বিয়ে করার সুযোগ পাবে–এটিই ছিল শর্ত।

সেই সময়ে কোরবানি কবুলের পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। তখন আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কবুল হওয়া কোরবানিটি পুড়িয়ে ফেলত। হাবিল ছিলেন পশুপালক, তিনি তাঁর পালের সবচেয়ে সুস্থ ও সুন্দর দুম্বাটি আল্লাহর নামে উৎসর্গ করেন। অন্যদিকে কাবিল ছিলেন কৃষক, তিনি অবজ্ঞাভরে কিছু নিম্নমানের শস্যদানা কোরবানির জন্য পেশ করেন। ফলে আকাশ থেকে আগুন এসে হাবিলের দুম্বাটি গ্রহণ করে নেয়, আর কাবিলের কোরবানিটি পড়ে থাকে।

সুরা মায়েদার ২৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে:

۞ وَٱتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ٱبْنَىْ ءَادَمَ بِٱلْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًۭا فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ ٱلْـَٔاخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ ۖ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلْمُتَّقِينَ ٢٧

”আদমের দু’পুত্রের খবর তাদেরকে সঠিকভাবে জানিয়ে দাও। উভয়ে যখন একটি করে কুরবানী হাজির করেছিল তখন তাদের একজনের নিকট হতে কবূল করা হল। অন্যজনের নিকট হতে কবূল করা হল না। সে বলল, আমি তোমাকে অবশ্য অবশ্যই হত্যা করব। অন্যজন বলল, ‘আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের কুরবানী কবূল করেন।”

পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদায় এই ঘটনার বর্ণনায় আল্লাহ বলেন, আল্লাহ কেবল মুত্তাকি বা সংযমীদের কোরবানি কবুল করেন। হাবিলের মনে ছিল আল্লাহর প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও নিষ্ঠা। তাই তিনি তার শ্রেষ্ঠ সম্পদটি দিয়েছিলেন। পক্ষান্তরে কাবিলের মনে ছিল অহংকার ও অবাধ্যতা। এ ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, কোরবানির পশুর আকার বা মাংসের চেয়ে দাতার মনের ‘তাকওয়া’ বা একনিষ্ঠতাই আল্লাহর কাছে মুখ্য।

সুরা মায়েদার ১ নং আয়াতে বলা হয়েছে:

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَوْفُوا۟ بِٱلْعُقُودِ ۚ أُحِلَّتْ لَكُم بَهِيمَةُ ٱلْأَنْعَـٰمِ إِلَّا مَا يُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ غَيْرَ مُحِلِّى ٱلصَّيْدِ وَأَنتُمْ حُرُمٌ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ ١

ওহে মু’মিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর। তোমাদের জন্য গৃহপালিত চতুস্পদ জন্তু হালাল করা হল- সেগুলো ছাড়া যেগুলোর বিবরণ তোমাদেরকে দেয়া হচ্ছে, আর ইহরাম অবস্থায় শিকার করা অবৈধ। আল্লাহ যা চান হুকুম দেন।

আদম (আ.) থেকে শুরু করে আজ অবধি কোরবানির মূল দর্শন একই রয়ে গেছে–আর তা হলো আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। লোক দেখানো আয়োজন বাদ দিয়ে যদি আমরা হাবিলের মতো শুদ্ধ মনে এবং পবিত্র উপার্জনে কোরবানি করতে পারি, তবেই আমাদের এই ত্যাগ সার্থক হবে।

লেখক- প্রাবন্ধিক

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular