ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅর্থনীতিঋণখেলাপির পর এবার লুটপাটের সংস্কৃতিতে ঢুকেছি: ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

ঋণখেলাপির পর এবার লুটপাটের সংস্কৃতিতে ঢুকেছি: ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

নিউজ ডেস্ক: এক সময়ে ব্যাংক খাতে ঋণখেলাপীর সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এখন লুটপাটের সংস্কৃতিতে ঢুকেছেন ঋণগ্রহীতারা বলে মনে করেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের উদ্ধোধনকালে তিনি কথা বলেন।

বিআইবিএম মিলনায়তনে ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে এবারের সম্মেলন শুরু হয়।

ওয়াহিদ উদ্দিন বলেন, ‘‘দেশের ব্যাংক খাত প্রথম নষ্ট হয়েছিল ঋণখেলাপির সংস্কৃতিতে। পরবর্তী সময়ে ঋণখেলাপির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু ২০১০ সালের পর নতুন করে তৈরি হয় ‘ব্যাংক লুটপাটের সংস্কৃতি’।

ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারি চাকুরিকালীন নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে সাবেক উপদেষ্টা বলেন, লুটপাটের কারণে আর্থিক খাত ‘খারাপ’ অবস্থায় চলে গিয়েছে।

ওয়াহিদউদ্দিন বলেন ‘‘ঋণখেলাপির সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার জন্য অনেক কষ্টে নানা নিয়মকানুন তৈরি করা হয়, সংস্কার করা হয়। পাশাপাশি বিধিবিধান বানিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলাম। কিছু বেসরকারি ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু এরপর শুরু হয় ব্যাংক লুটপাটের সংস্কৃতি। এটা আরও মারাত্মক। কোনো নিয়মকানুন ছাড়া ব্যাংক থেকে টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়।’’

ব্যাংক খাতের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাগাদা দিয়ে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘‘অতীতে আমরা উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো না বানিয়েই বেসরকারি খাতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছিলাম। এর পরিণতি কী হয়েছিল? সেই সময় আমরা দেখেছি যে উদ্যোক্তা পরিচালকেরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে মোট আমানতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঋণ হিসেবে তুলে নিয়েছিলেন।’’

আর্থিক খাতের মাধ্যমে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সমালোচনা করেন তিনি। এসময় ২০১০ সালের পরে অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হয়ে পড়েছে মন্তব্য করে ওয়াহিদউদ্দিন বলেন, ‘‘দেউলিয়া হয়ে যাওয়া কিছু ব্যাংক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করেছিল।’’

অতীতেও দুর্বল ব্যাংকের জন্য নীতিমালায় ছাড় দেওয়ার সুবিধা পরবর্তীতে পাওয়া যায়নি বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বর্তমানে অর্থনীতির যে শ্লথ গতি, ব্যাংক ও শিল্প খাতের তারল্য সংকট চলছে, তা থেকে উত্তরণে অনেকেই নিয়ম-কানুন শিথিল করার কথা বলছেন। অতীতে বিধি-বিধান অতিরিক্ত শিথিল করার কারণেই বর্তমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

এখন নীতিমালায় ছাড় দিলেও ভবিষ্যতে একই সমস্যার পূণরাবৃত্তি রোধে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা আগেভাগেই নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বেসরকারি ব্যাংকের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, ‘’২০ টি ব্যাংক এখন সঠিক পথে রয়েছে। বাকিগুলো খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে। ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপীর ৮০ শতাংশই ইচ্ছেকৃত খেলাপী, তাদের অনেকের টাকা ফেরত দেয়ার সামর্থ্য আছে। কিন্তু তারা এভাবে-সেভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে।’’

ব্যবসায়ীদের একটি অংশের মধ্যে উদ্বেগ এখনো রয়েছে। নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও কেনো এই উদ্বেগ রয়েছে তার সঠিক কারণ নেই বলে মনে করেন ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ(এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন।

এখন ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে নগদ টাকার প্রবাহ উল্লেখ করে তিনি বলেন, নীতিসুদ হার এখনো কম। মুদ্রানীতি এখন সংকোচনমূলক। কিন্তু ব্যাংকারদের বিভিন্ন প্যাকেজ বাস্তবায়নে বলা হচ্ছে। এটা তো নীতি ও বাস্তবায়নের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাহলে মুদ্রানীতি সম্প্রসারণমূলক করে দেখা যেতে পারে, কি হয়।

অসত্য তথ্য পরিবেশনার দিন শেষ উল্লেখ করে মাসরুর আরেফিন বলেন, শেখ হাসিনার আমলে আমরা আনন্দে ছিলাম, কারণ আমাদের বলা হতো খেলাপী ঋণ ৯ শতাংশ। আদতে এটা ছিল ৩০ শতাংশের উপরে। এখন অন্তত আমরা ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত চিত্র জানতে পারছি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল শেষে ঋণ খেলাপীর হার ছিল ৯ শতাংশ। চব্বিশের আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে ২০২৪ সালের জুন মাসে খেলাপীর হার দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার।

তিনি বলেন, শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর না করে ব্যাংকিং খাত সংস্কার, রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখা, বিনিময় হার আরও নমনীয় করা এবং শুল্ক কমানোর মতো পদক্ষেপও নিতে হবে।

এবারের প্রতিপাদ্যকে ‘সময়োপযোগী ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেন সম্মেলনের সভাপতি ও বিআইবিএমের মহাপরিচালক এজাজুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদ, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে ১৩টি প্লেনারি অধিবেশনে ১০৪টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে।

আরো খবর
Continue to the category
- Advertisment -spot_img

Most Popular