ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
বাংলাদেশ এক রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে অগ্রসরমান এই রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হচ্ছে দক্ষ মানবসম্পদ, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা। এই প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষার কাঠামো, বিশেষত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার বিস্তার, কেবল একটি নীতিগত অগ্রাধিকার নয়—এটি একটি কৌশলগত অপরিহার্যতা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো উচ্চশিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যায়নি। এই অসমতা দূরীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলায় একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা—যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রশাসনিক অবস্থান নয়; এটি একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
গফরগাঁও একটি ঐতিহাসিক, জনবহুল এবং শিক্ষাবান্ধব এলাকা। এখানকার শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষার জন্য রাজধানী বা বড় শহরে যেতে বাধ্য হয়। ফলে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং শিক্ষাগত বৈষম্য তৈরি হয়। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী সুযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়ে।
বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে প্রযুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি, রোবোটিক্স—এসব ক্ষেত্র ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস। বাংলাদেশেও ইতোমধ্যে ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং স্টার্টআপ সংস্কৃতি বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু এই খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য প্রয়োজন মানসম্মত প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
গফরগাঁওয়ে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে:
স্থানীয় শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তিগত শিক্ষা লাভ করতে পারবে
ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়বে
নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে
আঞ্চলিক অর্থনীতি শক্তিশালী হবে
একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের কেন্দ্র। একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে স্থানীয় ব্যবসা, আবাসন, পরিবহন এবং সেবা খাতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে।
তাহলে প্রশ্ন হলো—এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পেছনে যুক্তি কী? যদি এটি বাজেটের বিষয় হয়, তবে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। আর যদি এটি নীতিগত সীমাবদ্ধতা হয়, তবে তা পুনর্বিবেচনা করা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ “স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১” বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা অপরিহার্য। গফরগাঁওয়ে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এই লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।
আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণের জন্য শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য। বর্তমানে অধিকাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বড় শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। এই বৈষম্য দূর করতে হলে গফরগাঁওয়ের মতো এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি।
সমাধান হিসেবে ধাপভিত্তিক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে:
প্রথমে একটি ইনস্টিটিউট বা ক্যাম্পাস
পরে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর
PPP মডেলের মাধ্যমে অর্থায়ন
এছাড়াও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা অনুদান এবং প্রযুক্তি পার্টনারশিপের মাধ্যমে এই প্রকল্পকে আরও টেকসই করা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, গফরগাঁওয়ে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুধুমাত্র একটি আঞ্চলিক দাবি নয়; এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন। এটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
এখন সময় এসেছে—নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। গফরগাঁওকে একটি প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানকেন্দ্রে রূপান্তর করার সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়।
ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
গ্রাম ও পোস্ট – চরমছলন্দ
৩নং চরআলগী ইউনিয়ন।
গফরগাঁও, ময়মনসিংহ।




