নিউজ ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান আকাশযুদ্ধ ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও ইরান যেভাবে সামরিক প্রতিরোধ ও অভিযানের ক্ষমতা বজায় রেখেছে, তা আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের পুনরায় ভাবতে বাধ্য করছে। সম্প্রতি বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়া তার নিজস্ব স্যাটেলাইট নজরদারি ও ‘সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স’ (সিগইন্ট) তথ্য নিয়মিত ইরানের কাছে পাচার করছে। মস্কোর এই পরোক্ষ গোয়েন্দা সহায়তা তেহরানের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ।
ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের নিজস্ব কোনো শক্তিশালী বা দূরপাল্লার স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক নেই। এই ঘাটতি পূরণে রাশিয়ার মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তি মূল ভূমিকা রাখছে। যদিও ইরান ২০২২ সালে রাশিয়ান সয়ুজ রকেটের মাধ্যমে ‘খৈয়াম’ নামের একটি ইমেজিং স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছিল, তবে একক কোনো স্যাটেলাইটের পক্ষে বিশাল মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক চলাচলের ওপর ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক নজর রাখা অসম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া তাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট বহর ব্যবহার করে অপটিক্যাল ছবি, রাডার ইমেজিং এবং ইলেকট্রনিক সিগন্যাল সংগ্রহ করছে। এতে মেঘলা আকাশ বা রাতের আঁধারেও মার্কিন বিমানঘাঁটি, রণতরীর অবস্থান, রাডার সিস্টেম এবং বিমান চলাচলের সঠিক গতিপথ চিহ্নিত করতে পারছে ইরান।
রাশিয়ার দেওয়া এই সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত যোগাযোগের ফ্রিকোয়েন্সি, রাডার মোড এবং উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্রের ইলেকট্রনিক সংকেত বিশ্লেষণ করতে পারছে ইরানি সামরিক বাহিনী। এটি মার্কিন তৈরি নির্ভুল মিসাইল ও বিমানগুলোকে জ্যাম করা কিংবা বিভ্রান্ত করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
গোয়েন্দা তথ্যের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে মার্কিন বাহিনীর লজিস্টিক বা রসদ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। যুদ্ধবিমানের চেয়ে ফুয়েল ট্যাঙ্কার, গোলাবারুদের ডিপো, মেরামত কেন্দ্র এবং বন্দরের মতো মার্কিন রসদ কেন্দ্রগুলো অপেক্ষাকৃত কম গতিশীল। রাশিয়া থেকে প্রাপ্ত মানচিত্র ও দূর অনুধাবন তথ্যের সাহায্যে ইরান এই লজিস্টিক নেটওয়ার্কগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
রাশিয়া ও ইরানের এই গোয়েন্দা লেনদেন মূলত একটি পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতার ফল। ২০২২ সালের পর থেকে ইরান রাশিয়ার কাছে প্রচুর পরিমাণে ‘শাহেদ-১৩১’ ও ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোন এবং এর নির্মাণ প্রযুক্তি সরবরাহ করেছিল, যা রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তাদের প্রতিরক্ষা যোগাযোগ আরও সুসংগঠিত হয়। বর্তমানে রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে বা সৈন্য না পাঠিয়েও তেহরানকে প্রযুক্তিগত সাহায্য প্রদান করে ওয়াশিংটনকে বিশ্বজুড়ে এক চাপে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে।
যদিও ওয়াশিংটন ও মস্কোর শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই সহায়তার মাত্রা নিয়ে নানা কূটনৈতিক মন্তব্য এসেছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) স্বীকার করেছে যে রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিগুলো বিভিন্ন মাত্রায় ইরানকে সক্ষম করে তুলছে।
তবে রাশিয়া স্যাটেলাইট ডেটা দিয়ে সাহায্য করলেও ইরান কত দ্রুত সেই তথ্য ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালাতে পারছে, তা এখনো অনিশ্চিত। তা সত্ত্বেও, এই গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে কেবল আঞ্চলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ রাখেনি; এটি বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটন ও মস্কোর একটি অদৃশ্য ছায়াযুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কৌশলকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।




