নাজমুল হোসেন, বিশেষ সংবাদদাতা : মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা এলেই লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার মেঘনাপাড়ের জেলেদের জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। বছরে প্রায় চার মাস নদীতে মাছ ধরতে না পারায় আয়হীন হয়ে পড়ছেন তাঁরা। সরকারি সহায়তা থাকলেও তা সবার কাছে পৌঁছায় না—ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে নামছেন।
কমলনগর উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার নিবন্ধিত জেলে থাকলেও চাল পেয়েছেন ৭ হাজার ৭০০ জন। খাদ্যসামগ্রী পেয়েছেন মাত্র দেড় হাজার জেলে। অন্যদিকে সাগরে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞায় বরাদ্দ পেয়েছেন ১ হাজার ৮১৫ জন।
রামগতি উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন প্রায় সাড়ে ২১ হাজার। এর মধ্যে চাল পেয়েছেন ১৩ হাজার ৭০০ জন এবং খাদ্যসামগ্রী পেয়েছেন দেড় হাজার জেলে। ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞায় বরাদ্দ পেয়েছেন ১৭ হাজার ৮৬০ জন।
তবে স্থানীয়দের দাবি, নিবন্ধিত তালিকার বাইরেও কয়েক হাজার প্রকৃত জেলে রয়েছেন, যারা কোনো ধরনের সহায়তা পান না।
কমলনগরের জেলে নুরুল ইসলাম বলেন, “ছোটবেলা থেকে নদীতে নৌকা চালিয়ে সংসার চালাই। ২০-২৫ বছর ধরে মাছ ধরি। কিন্তু এখনো জেলে কার্ড পাইনি।” তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় কোনো আয় থাকে না, তখন অন্যের জমিতে কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাতে হয়।
রামগতির কালকিনি ইউনিয়নের জেলে মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, নিবন্ধিত জেলে হয়েও তিনি বরাদ্দ পাননি। “ছয়জনের সংসার। নদীতে মাছ ধরা ছাড়া কোনো আয় নেই। কিন্তু সরকারের চাল আমার ভাগ্যে জোটেনি,” বলেন তিনি।
চর লরেন্স ইউনিয়নের আবুল হোসেন (৫০) বলেন, নদীভাঙনে সব হারিয়ে জীবিকার তাগিদে মাছ ধরছেন। “কয়েকবার চেষ্টা করেও জেলে নিবন্ধন করতে পারিনি। নিষেধাজ্ঞার সময় খুব কষ্টে দিন কাটে,” বলেন তিনি।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান মোফাজ্জল মাঝি, শরীফ ও নিজাম উদ্দিন মাঝিসহ আরও অনেক জেলে। তাঁদের অভিযোগ, নিবন্ধন না থাকায় বা বরাদ্দ না পাওয়ায় নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবার নিয়ে চরম কষ্টে থাকতে হয়।
জেলেরা জানান, মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোনো কাজে তাঁদের দক্ষতা নেই। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময় অন্য পেশায় যেতে হিমশিম খেতে হয়। কেউ কেউ কৃষিকাজ বা দিনমজুরির কাজ করলেও তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বরাদ্দ না পেয়ে অনেক জেলে ঝুঁকি নিয়েই নদীতে নামছেন। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যও ব্যাহত হচ্ছে।
কমলনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তুয্য সাহা বলেন, “সরকারের বরাদ্দ সীমিত হওয়ায় সব জেলের মধ্যে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক প্রকৃত জেলে তালিকার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকলে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতো।”
তিনি আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরলে আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে জীবিকার তাগিদে অনেকেই তা মানছেন না।



