মাহমুদ মীর
বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাস আর ধোপাকন্যা রজকিনী নিয়ে এক অমর প্রেমের উপকথা আমাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের বিরুদ্ধে চৈতন্যের কষাঘাত।
এই কাহিনীর সত্যতা বিচার নয় এর অন্তর্নিহিত আবেদন আর সংগ্রাম যুগে যুগে সাধারণ মানুষের মনে শ্বাশ্বত প্রেমের গভীরতা শিখিয়েছে।
উপকথার কাহিনী হয়ত সামান্য সত্য, কিন্তু কবির কল্পনা আর সমাজে বিরাজমান ছুঁয়াছুঁয়ি সংস্কৃতি বিরোধী মনোভাব আবিষ্কার এবং সমাজের মানুষগুলোর চেতনাকে নাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারটি কম নয়।
এই দুই ‘প্রেমের শিরোমণি, বারো বছর বড়শি বাইল তবু আধার গিললো না’। উপকথা আর সত্যের সীমারেখা ডিঙিয়ে শোনা যায় এক বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাস আর ধোপাকন্যা রামীর কথা।
‘রজকিনী’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় ‘ধোপাকন্যা’। ব্রাহ্মণ পরিবারের নানান ছুঁৎমার্গ ছিল। স্বাভাবিকভাবে, ধোপার মেয়ে ছুঁলেও সে সময়ে তাদের জাত যাওয়া অবাক কিছু ছিল না।
সেই কঠিন সময়ে অন্ধকারে জনপ্রিয়তার উঁচু আসন অধিকার করেছিল এই উপকথা।
ব্রাহ্মণসন্তান চণ্ডীদাস প্রেমে পড়লেন জাতপাতের চিন্তা না করেই যা প্রমাণ করে প্রেম কোনোকালে এসব পরোয়া করে না। যে ঘাটে রজকিনী কাপড় ধুতে আসতেন, চণ্ডীদাস প্রতিদিন নিয়ম করে সেখানে মাছ ধরতে যেতেন।
এক যুগ ধরে শুধু এই অপেক্ষাই। কথা নেই, বার্তা নেই। নিজে থেকে চণ্ডীদাস কখনো আলাপ জুড়ে দেননি, তবে রজকিনীও হয়তো বুঝতেন— তার জন্যই প্রতিদিন এসে ধরনা দিচ্ছেন এই কাব্যমনা মানুষটি।
দীর্ঘ ১২টি বছর পর একদিন সেই রজকিনী শুধোলেন, ‘বড়শিতে কী মাছ ধরলা?’ চণ্ডীদাস মুখ তুলে উত্তর দিলেন, ‘১২ বছর পর এইমাত্র ঠোকর দিল।’
অপেক্ষার ফল সুমিষ্ট হয়, কথাটা ফলে গেলো আবারও। সেই থেকে শুরু তাদের পরিচয় কিংবা প্রেমালাপের। খুব স্বাভাবিকভাবেই তৎকালীন সমাজব্যবস্থা তাদের এই ‘অসম’ প্রেমকে মেনে নেয়নি।
বহু অপমান-অপবাদের শিকার হতে হয়েছে, বিশেষ করে চণ্ডীদাসকে, কেন না তিনিই ছিলেন তথাকথিত উঁচু শ্রেণির বাসিন্দা। তার পিতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও অস্বীকৃতি জানায় সেখানকার ব্রাহ্মণসমাজ।
এসব কিছুর পরও অবশ্য নিজের সঙ্গীর কাছ থেকে দূরে সরেননি তিনি। বিপদে-আপদে এক সঙ্গেই থেকেছেন। শেষমেশ রামী, পরবর্তীতে ‘রজকিনী’ নামেই অধিক পরিচিত সেই নারীটিকে তার সাধনসঙ্গিনী হিসেবে মেনে নিতে একপ্রকার বাধ্য হয় সবাই।



