ঢাকা  শনিবার, ২৬শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশচালক-তেল সংকটে অচল ‘স্বপ্নযাত্রা’ রামগতির খালে পড়ে ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স, সেবা থেকে বঞ্চিত...

চালক-তেল সংকটে অচল ‘স্বপ্নযাত্রা’ রামগতির খালে পড়ে ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স, সেবা থেকে বঞ্চিত ২০ হাজার মানুষ

নাজমুল হোসেন, বিশেষ সংবাদদতা : লক্ষ্মীপুরের প্রান্তিক চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চালু করা হয়েছিল ‘স্বপ্নযাত্রা’ অ্যাম্বুলেন্স সেবা। প্রকল্পের অংশ হিসেবে রামগতি উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চর আব্দুল্লাহ, তেলিয়ার চর ও চরগজারিয়ার প্রায় ২০ হাজার মানুষের জন্য চালু করা হয় একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স (স্পিডবোট)। তবে চালুর পর থেকেই চালক ও জ্বালানি সংকটে এটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বর্তমানে সেটি বিকল অবস্থায় রামগতি পৌরসভার আলেকজান্ডার এলাকার সেন্টার খালে পড়ে আছে।

স্থানীয়দের ভাষায়, “যে অ্যাম্বুলেন্স মানুষের জীবন বাঁচাবে, সেটিই এখন নিজেই অসহায়।”

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ৬ অক্টোবর তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) আনোয়ার হোছাইন আকন্দ ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি উদ্বোধন করেন। ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাইকা, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি কেনা হয়। উদ্দেশ্য ছিল নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের মানুষের দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা।

তবে উদ্বোধনের সময় কোনো চালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পরে চালক সংকট ও জ্বালানি ব্যয়ের কারণে এটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি।

উদ্বোধনের তিন বছর ছয় মাস পর দেখা যায়, ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি আলেকজান্ডার এলাকার সেন্টার খালে পড়ে আছে। দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকায় এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চরাঞ্চল থেকে রোগী আনতে এই অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করলে খরচ হতো সাধারণ নৌকার তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি। ফলে দরিদ্র বাসিন্দারা এটি ব্যবহার করতে আগ্রহী হননি।

২০২২ সালে ‘স্বপ্নযাত্রা’ প্রকল্পের আওতায় জেলার পাঁচ উপজেলায় ১৬টি স্থল অ্যাম্বুলেন্স ও একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়। প্রতিটির জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ২০ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় চালক নিয়োগের দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।

স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক বলেন, “উদ্যোগটি ভালো ছিল। কিন্তু পরিচালনা কাঠামো না থাকায় এটি টেকেনি।” উল্লেখ্য, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তৎকালীন ডিসি আনোয়ার হোছাইন আকন্দ ‘বঙ্গবন্ধু জনপ্রশাসন পদক’ পান।

স্বপ্নযাত্রা অ্যাম্বুলেন্সগুলো চালুর পরপরই নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সূত্র জানায়, স্বল্প দূরত্বে রোগী পরিবহনের বদলে চালকেরা দীর্ঘ দূরত্বে (ঢাকা-চট্টগ্রাম) রোগী নেওয়ার দিকে বেশি আগ্রহী ছিলেন।

এছাড়া বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কাজে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর নির্বাচনী কাজে একটি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।

একই বছরের ১৮ আগস্ট রাজনৈতিক সভায় যাওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা হয়।

২০২৪ সালের জুনে রোগীর পরিবর্তে সাধারণ যাত্রী পরিবহনের ঘটনাও দেখা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে এক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, “অ্যাম্বুলেন্স পড়ে থাকত, ভাড়া পাওয়া যেত না। চালকের বেতন চালাতে বাধ্য হয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।”

প্রকল্প চালুর পরপরই সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের বদলি হলে কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। পরবর্তী কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় এই প্রকল্প ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমান জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই প্রকল্পটি সরাসরি জেলা প্রশাসন বাস্তবায়ন করেছে। স্বাস্থ্য বিভাগকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। ফলে আমরা এতে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারিনি।”

চর আব্দুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মঞ্জু বলেন, “নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলের মানুষের জন্য ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু শুরু থেকেই এটি চালু করা যায়নি। ফলে কোনো উপকারই পাওয়া যায়নি।”

একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান জানান, স্থায়ী অর্থায়ন ও চালক নিয়োগের ব্যবস্থা না থাকায় অ্যাম্বুলেন্সগুলো ইউনিয়ন পরিষদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, “ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি অকার্যকর অবস্থায় থাকার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। কেন এটি এতদিন চালু হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হবে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular