ঢাকা  বুধবার, ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামজনসংখ্যা নয়, সুস্থ প্রজন্মই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি

জনসংখ্যা নয়, সুস্থ প্রজন্মই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি

হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান
৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং, রবিবার

প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে শিক্ষা, দক্ষতা ও শারীরিক সক্ষমতার সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জনশক্তির শক্তি। একটি দেশের উন্নয়ন আমরা সাধারণত কিছু দৃশ্যমান সূচকের মাধ্যমে বিচার করি-অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, রাস্তাঘাট, সেতু, শিল্পকারখানা, প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা শিক্ষার বিস্তার।

এসব নিঃসন্দেহে উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। কিন্তু একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা পেতে হলে শুধু তার বর্তমান অবকাঠামো, অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দিকে তাকালে হয় না; তাকাতে হয় তার শিশু ও তরুণদের দিকে। তারা কীভাবে বেড়ে উঠছে, কী খাচ্ছে, কতটা শারীরিকভাবে সক্রিয়, কীভাবে অবসর কাটাচ্ছে, প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করছে এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য কতটা প্রস্তুত হচ্ছে-এসব প্রশ্নের উত্তরেই অনেকটা লুকিয়ে আছে আগামী বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র।

এই উপলব্ধিটি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে আরও স্পষ্ট হয়েছে। প্রায় পাঁচ দশক আগে আমার নিজের শৈশবের দিকে তাকালে বর্তমান সময়ের সঙ্গে একটি বড় পার্থক্য চোখে পড়ে। সেই পার্থক্যকে অবশ্য ‘আগে ভালো ছিল, এখন খারাপ’-এই সরল ব্যাখ্যায় দেখার সুযোগ নেই।

সময় বদলেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে, মানুষের সুযোগ বেড়েছে, প্রযুক্তি এসেছে এবং পৃথিবী মানুষের হাতের নাগালে চলে এসেছে। আমাদের প্রজন্ম যে অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে বড় হয়েছে, সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এমন কিছু নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেগুলোকে এখন গুরুত্ব দিয়ে না দেখলে আগামী দিনে আমাদের উন্নয়নের হিসাবটি অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।

বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার সঙ্গে শিক্ষা, দক্ষতা, শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক সুস্থতার ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা যায়, সেটি এখন শুধু পরিবার বা ব্যক্তির বিষয় নয়; এটি জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

১৯৭১ সালে আমি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। পূর্ব পাকিস্তান তখন মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে। চারদিকে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক, অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের অজানা শঙ্কা। নিয়মিত তিন বেলা মাছ-ভাত পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে উঠত। আমাদের বাড়িটি ছিল সাত পরিবারের একটি বড় যৌথ পরিবার। বড় জেঠা বাড়িতে থাকতেন; অন্যরা যুদ্ধ, চাকরি কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে শহরে থাকতেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৭ জন মানুষের বসবাস ছিল সেই বাড়িতে।

আমার জেঠাতো ভাই মাহফুজ, দুলাল, জেঠাতো বোন নাসিমা ও শেলী-আমরা ছিলাম প্রায় সমবয়সী। আমাদের শৈশবের বিনোদনের জন্য আলাদা কোনো আয়োজন ছিল না। জীবনই ছিল আমাদের বিনোদন। কখনো মাছ ধরতে যেতাম, কখনো শালুক-শাপলা তুলতাম, কখনো কচুর ঘাটি সংগ্রহ করতাম। গ্রীষ্মের বিকেলে স্কুলের ফাঁকে ডাংগুলি, দাঁড়িয়াবান্ধা, কুতকুত, মার্বেল কিংবা কাবাডি খেলতাম। বর্ষাকালে ঘরে বসে লুডু বা দাবা খেলতাম। কখনো কয়েকটি সিমের বিচি হাতে নিয়ে জোড়-বিজোড় খেলায় মেতে উঠতাম। আমাদের তখন স্মার্টফোন ছিল না, ভিডিও গেম ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না।

কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমাদের জীবন আদর্শ ছিল। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও নানা সীমাবদ্ধতা ছিল সেই জীবনের বাস্তবতা। সেই কষ্ট, সেই অভাব কিংবা সেই অনিশ্চয়তা আমরা কোনোভাবেই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কামনা করি না। বরং আমরা চাই আমাদের সন্তানরা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো জীবন পাক। তবে সেই কঠিন জীবনের মধ্যেও এমন একটি বিষয় ছিল, যা আজকের জীবন থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে-শরীরকে স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করার অভ্যাস।

আমরা আলাদা করে ব্যায়াম করতাম না, কারণ হাঁটা, দৌড়ানো, খেলাধুলা, সাঁতার, মাঠে ছুটে বেড়ানো কিংবা পারিবারিক ও কৃষিজীবনের নানা কাজে অংশ নেওয়ার মধ্যেই শরীর সক্রিয় থাকত। তখন ‘ফিটনেস’ শব্দটি হয়তো আমরা জানতাম না, কিন্তু জীবন নিজেই আমাদের শিখিয়ে দিত যে শরীরকে সচল রাখার জন্য আলাদা কোনো বিলাসী আয়োজনের প্রয়োজন নেই। আমাদের দৈনন্দিন জীবনই ছিল এক ধরনের স্বাভাবিক শারীরিক অনুশীলন।

আজকের প্রজন্মের সামনে সেই বাস্তবতা নেই, আর থাকাও উচিত নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা সেই জীবন থেকে কী শিখতে পারি? উত্তরটি অতীতে ফিরে যাওয়ার মধ্যে নয়; বরং অতীতের কিছু সুস্থ অভ্যাসকে বর্তমানের আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা যায়, তার মধ্যে।

আজকের পৃথিবী নিঃসন্দেহে আমাদের সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক। একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে বিশ্বের বিপুল জ্ঞান মানুষের হাতে চলে এসেছে। অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল ব্যাংকিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক চিকিৎসা, দ্রুত যোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার মানুষের জীবনকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যা কয়েক দশক আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। তাই প্রযুক্তিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর কোনো যুক্তি নেই। আগামী বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্প ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে প্রযুক্তি আরও গভীরভাবে যুক্ত হবে এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া ভবিষ্যৎ কর্মবাজারে টিকে থাকাও কঠিন হবে।

সমস্যা প্রযুক্তির অস্তিত্বে নয়; সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রযুক্তি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, চলাফেরা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার জায়গা দখল করতে শুরু করে। একটি শিশু যদি পড়াশোনা, খেলাধুলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, ঘুম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজের বাইরে দিনের বড় অংশ স্ক্রিনে কাটায়, তাহলে তার জীবনযাত্রায় ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

একইভাবে একজন তরুণ যদি যাতায়াত, কাজ ও অবসরের প্রায় পুরো সময়টাই বসে কাটায়, তাহলে শরীরের স্বাভাবিক সক্রিয়তা কমে যায়। প্রযুক্তি আমাদের সময় বাঁচাচ্ছে, পরিশ্রম কমাচ্ছে এবং কাজকে সহজ করছে-এটি নিঃসন্দেহে ভালো; কিন্তু সেই বাঁচানো সময় যদি শেষ পর্যন্ত আরও বেশি বসে থাকা, আরও বেশি স্ক্রিনে থাকা এবং আরও কম শারীরিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়, তাহলে সুবিধার সঙ্গে নতুন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করছে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৩১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৮১ শতাংশ কিশোর-কিশোরী প্রয়োজনীয় মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড করে না।

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার সঙ্গে হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, কিছু ক্যানসার এবং বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের জন্য WHO প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুপারিশ করেছে।

ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করছে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৩১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৮১ শতাংশ কিশোর-কিশোরী প্রয়োজনীয় মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড করে না।

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার সঙ্গে হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, কিছু ক্যানসার এবং বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের জন্য WHO প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুপারিশ করেছে।

ফলে খেলাধুলাকে শুধু বিনোদন কিংবা অবসর কাটানোর উপায় হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়; এটি সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতা ধরে রাখারও অংশ।

বিশ্বের এই প্রবণতা বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক। WHO-নেতৃত্বাধীন একটি বড় গবেষণায় ২০০১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ১৪৬ দেশের প্রায় ১৬ লাখ স্কুলগামী কিশোর-কিশোরীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কিশোর-কিশোরী প্রয়োজনীয় মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড করছিল না। মেয়েদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল আরও উদ্বেগজনক।

অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এটি ২০১৬ সালের তথ্য; তাই এটিকে আজকের বাংলাদেশের হুবহু চিত্র বলা যাবে না। কিন্তু একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বোঝার ক্ষেত্রে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের জীবন ক্রমেই শহরমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বসে থাকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।

শহরের আবাসিক এলাকায় খেলার মাঠের সংকট, নিরাপদে হাঁটা বা সাইকেল চালানোর সুযোগের অভাব, শিক্ষাজীবনের অতিরিক্ত চাপ এবং বিনোদনের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল নির্ভরতা-সব মিলিয়ে শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক কর্মকাণ্ডের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ একসময় প্রধানত খাদ্য ও অপুষ্টির সমস্যার সঙ্গে লড়েছে। সেই সমস্যা এখনও শেষ হয়নি। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের সামনে আরেকটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে-অতিরিক্ত ক্যালরি, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা।

UNICEF Bangladesh-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে Stunting ও Wasting- এর মতো অপুষ্টির সমস্যা এখনও রয়েছে; একই সঙ্গে শিশু ও কিশোরদের অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতাও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। অর্থাৎ আমাদের পুষ্টি-চ্যালেঞ্জ এখন আর কেবল ‘খাবার নেই’-এই একমাত্র সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন এখন খাবারের পরিমাণের পাশাপাশি তার গুণগত মান, পুষ্টিমান, খাদ্যাভ্যাস এবং সেই খাবারের সঙ্গে শরীর কতটা সক্রিয় থাকছে-এসব নিয়েও।

এখানেই পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শুধু বেশি খাওয়ানোকে যত্নের প্রমাণ হিসেবে দেখলে হবে না; কী খাচ্ছে, কতটা খাচ্ছে, কখন খাচ্ছে এবং তার জীবনযাত্রা কতটা সক্রিয়-এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

একটি শিশু পর্যাপ্ত খাবার পেলেই যে সুস্থ থাকবে, এমন নয়; তার প্রয়োজন সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন। বাংলাদেশ শিক্ষার বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম আমাদের প্রজন্মের তুলনায় বেশি শিক্ষিত, প্রযুক্তিতে বেশি অভ্যস্ত এবং বিশ্বের সঙ্গে অনেক বেশি সংযুক্ত। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের একটি বড় অর্জন।

কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য তখনই তৈরি হয়, যখন তা দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়। বাংলাদেশ শিক্ষার বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম আমাদের প্রজন্মের তুলনায় বেশি শিক্ষিত, প্রযুক্তিতে বেশি অভ্যস্ত এবং বিশ্বের সঙ্গে অনেক বেশি সংযুক্ত।

এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের একটি বড় অর্জন। কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য তখনই তৈরি হয়, যখন তা দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়। 

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করলেও নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ। একই সঙ্গে তরুণদের দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল কাজের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই বাস্তবতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আমরা কতজন তরুণকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ দিতে পারছি, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-সেই শিক্ষা দিয়ে তারা বাস্তবে কী করতে পারছে।

একজন শিক্ষিত তরুণ যদি বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে না পারে, কর্মক্ষেত্রের চাপ সামলাতে না পারে, দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারে কিংবা দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্য ধরে রাখতে না পারে, তাহলে শুধু সার্টিফিকেট দিয়ে তার পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব নয়।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য তাই শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল কিংবা সনদ অর্জন হওয়া উচিত নয়। শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং সুস্থ জীবনযাপনের অভ্যাসকেও যুক্ত করতে হবে। 

আজকের শিশু শুধু আগামী দিনের নাগরিক নয়; সে আগামী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি। তাই তাদের সুস্থতা, শিক্ষা ও দক্ষতার প্রতি বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। আর সেই বিনিয়োগের সময়টা ভবিষ্যতে নয়, এখনই।

লেখক: সংগ্রাহক ও গবেষক

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular