নিউজ ডেস্ক : দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বৈষম্যহীন ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়ন এবং সর্বনিম্ন বেতন ৩৫,০০০ টাকা নির্ধারণসহ সাতদফা দাবিতে সরকারি কর্মচারীরা আন্দোলনের ডাক দিয়েছে।
‘বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ’-এর ব্যানারে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। সংগঠনটির শীর্ষ নেতা জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ১৬ জানুয়ারি (শুক্রবার) সকাল ৯:৩০ থেকে ১২:৩০ পর্যন্ত জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতীকী অনশন কর্মসূচি পালিত হবে।
২০১৫ সালের পর দীর্ঘ এক দশক পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো পে-স্কেল ঘোষণা না করায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। চলতি মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যবৃদ্ধিতে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ১১–২০ গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। ঐক্য পরিষদের নেতাদের দাবি, বর্তমান বেতন কাঠামোতে সাধারণ কর্মচারীদের পক্ষে পরিবার চালানো এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতা মোকাবিলা এবং বেতন বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে তারা নতুন কর্মসূচিতে যাচ্ছে।
৭ দফা দাবির উল্লেখযোগ্য বিষয়সমূহ
সরকারি কর্মচারীরা যে সাত দফা দাবি তুলেছে তার মধ্যে কয়েকটি মুখ্য বিষয় হলো:
পে-কমিশন গঠন: অবিলম্বে বৈষম্যহীন ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্থায়ী পে-কমিশন গঠন।
সর্বনিম্ন বেতন: বেতন বৈষম্য কমিয়ে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৩৫,০০০ টাকা নির্ধারণ।
বেতন অনুপাত: বেতন গ্রেডের অনুপাত পুনর্গঠন করে ১:৪ অনুপাত নিশ্চিত করা।
মহার্ঘ ভাতা: নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন ৫০% মহার্ঘ ভাতা প্রদান।
টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড: পূর্বের ন্যায় টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পদ্ধতি পুনঃস্থাপন।
অভিন্ন নিয়োগবিধি: সচিবালয় ও অন্যান্ন সকল দপ্তরের জন্য একই নিয়োগবিধি প্রণয়ন ও পদনাম পরিবর্তন।
রেশনিং ব্যবস্থা: সরকারি কর্মচারীদের জন্য সুলভ মূল্যে রেশনিং কার্যক্রম চালু করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমকে বলেছেন, “নতুন পে-স্কেল ঘোষণার কোনো সম্ভাবনা নেই” এবং অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবে না, যা যুক্তিসঙ্গত।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ (১৩ জানুয়ারি) সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পে-স্কেল দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে পে-কমিশন কাজ করছে, কমিশনের রিপোর্ট পাওয়ার পরে পে-স্কেল নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে”।
তিনি আরও বলেন, কমিশনকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে এবং সময় পেলে মেয়াদ শেষের আগেই পে-স্কেল ঘোষণা করে দেওয়া হবে; নতুবা নির্বাচিত সরকার এসে তা বাস্তবায়ন করবে।
সরকারের তরফে জানা গেছে যে জাতীয় বেতন কমিশনের চূড়ান্ত সভা আগামী ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বসবে এবং সেখানেই নবম পে-স্কেল সংক্রান্ত সুপারিশগুলো চূড়ান্ত হবে। সূত্র বলছে, কমিশন গঠনের শুরু থেকেই ১:৮ অনুপাত চূড়ান্ত করেছে এবং সর্বনিম্ন বেতনের জন্য ২১,০০০ টাকা (প্রধান প্রস্তাব), ১৭,০০০ টাকা ও ১৬,০০০ টাকার তিনটি প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সুপারিশ দেরিতে কার্যকর করা হতে পারে। এই প্রস্তাবনা অনুযায়ী চলতি কমিশনের প্রতিবেদনে শুধু বেতন বৃদ্ধিই নয়, মূল্যস্ফীতি, জীবিকার ব্যয়, পরিবারের সদস্যসংখ্যা ইত্যাদিও বিবেচনায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সরকারের এই অবস্থানের পর কর্মচারী নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে পরিকল্পিত কর্মসূচির মধ্যে আদেশভঙ্গ করা হবে না। ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক ওয়ারেছ আলী বলেছেন, “আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে সব বাধ্যবিধি মেনে আন্দোলন করবো, তবে চূড়ান্ত দাবি আদায় না হলে কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব”।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১৬ জানুয়ারির অনশন কর্মসূচির পর দাবি না মানলে তারা সচিবালয় ঘেরাওসহ দেশব্যাপী অনির্দিষ্ট কালীন কর্মবিরতির মতো কঠোর কর্মসূচি নিতে পারে। অন্য দিকে, সম্প্রতি পে-কমিশনের সম্ভাব্য সুপারিশের গুঞ্জনে সর্বনিম্ন বেতন টাকা ১৬,০০০–২১,০০০ শোনালেও কর্মচারীরা তা একেবারেই প্রত্যাখ্যান করছেন; তাদের মতে ৩৫,০০০ টাকা ছাড়তে কোনো প্রশ্ন নেই।
পে-স্কেল নিয়ে সরকারের ঘোষণাপূর্ব মুহূর্তের এ উত্তাপ প্রমাণ করে যে নির্বাচনের আগে বেতন কাঠামো নিয়ে কোন সংযম ধরা যাচ্ছে না। তা সত্ত্বেও দীর্ঘসময়ের আন্দোলনের পর সরকারি কর্মচারীরা তাদের দাবিতে দৃঢ় অবস্থানে আছেন এবং আগামী কর্মসূচিগুলো হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছেন।
ঢাকানিউজ২৪/মহফ




