মাহমুদ মীর
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে গেছে। এর প্রভাব এখন শুধু ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বিশ্বজুড়েই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েলের চাপ ও উসকানির প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন বলে খবর বেরিয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের কারণে তিনি এখন নানা ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও তার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, এই সামরিক পদক্ষেপ আদৌ কতটা প্রয়োজন ছিল এবং এর ফল কী হতে পারে। এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভূরাজনৈতিকভাবে সত্যিই কোনো বড় সাফল্য বয়ে আনবে কি না, এ প্রশ্নও এখন প্রকট।
রয়টার্স বলছে, হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। জল, স্থল ও আকাশপথে ইরানি বাহিনীর ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে দুই মিত্র রাষ্ট্র। এর পরই সংকটটি দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে পরিণতি ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
হোয়াইট হাউসে দুই মেয়াদে থাকা ট্রাম্প এর আগে সাধারণত এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে গেছেন। তিনি বরং দ্রুত ও সীমিত সামরিক অভিযানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় আকস্মিক অভিযান বা জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করেছিলেন।
ওয়াশিংটনের জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের লরা ব্লুমেনফেল্ড বলেন, ‘ইরান আক্রমণ একটি জটিল এবং সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান। ট্রাম্প এখানে বৈশ্বিক অর্থনীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ফলাফলের ঝুঁকি নিচ্ছেন।’
ক্ষমতায় এসে ‘অর্থহীন’ সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ট্রাম্প এখন এমন এক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন, যাকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উন্মুক্ত যুদ্ধ’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের কোনো আসন্ন হুমকি না থাকলেও এই অভিযান শুরু করা হয়েছে, যদিও প্রেসিডেন্ট ও তার সহযোগীরা ভিন্ন দাবি করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’র উদ্দেশ্য ও শেষপর্যায়ের পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প। যুদ্ধের যৌক্তিকতা ও ‘জয়’ বলতে কী বোঝাবে, সে বিষয়েও তার বক্তব্য বারবার বদলাচ্ছে। অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এ মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘ট্রাম্প স্পষ্টভাবে তার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এগুলো হলো—ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করা, তাদের নৌবাহিনী অকার্যকর করা, প্রক্সি বাহিনীকে অস্ত্র দেওয়ার সক্ষমতা বন্ধ করা এবং ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়া।’
তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে, যুক্তরাষ্ট্রের হতাহতের সংখ্যা বাড়লে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়লে, ট্রাম্পের এই বড় পররাষ্ট্রনীতির জুয়া রাজনৈতিকভাবে রিপাবলিকান পার্টির জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।
ইরান ইস্যুতে সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে সমালোচনার মুখে পড়লেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড এখনো তার সমর্থকদের বড় অংশের সমর্থন পাচ্ছেন। তার রাজনৈতিক আন্দোলন মাগার (মেইক আমেরিকা গ্রেপ এগেইন) অনেক সদস্যই আপাতত তাকে সমর্থন দিচ্ছেন।
তবে এই সমর্থন যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে রিপালিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে স্বতন্ত্র ভোটাররা, এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ ব্রায়ান ডার্লিং বলেন, “আমেরিকানরা ইরাক ও আফগানিস্তানের ভুল আবার করতে চায় না। এমএজিএ সমর্থকদের মধ্যেও বিভাজন আছে। কেউ ট্রাম্পের ‘নতুন যুদ্ধ না করার’ প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করেছিলেন, আবার কেউ তার সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত।”
বিশ্লেষকদের মতে, বড় উদ্বেগের একটি হলো ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তায় অসামঞ্জস্যতা, বিশেষ করে ইরানে ‘শাসন পরিবর্তন’ চাওয়া হচ্ছে কি না—এ প্রশ্নে।
সংঘাতের শুরুতে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের শাসকদের উৎখাত করাও একটি লক্ষ্য হতে পারে, অন্তত অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ উসকে দিয়ে। কিন্তু দুই দিন পর তিনি সে বিষয়টিকে অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেননি।
পরে বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে তিনি ভূমিকা রাখতে চান এবং ইরানি কুর্দি বিদ্রোহীদের হামলা চালাতে উৎসাহ দেন। এরপর শুক্রবার সামাজিক মাধ্যমে তিনি ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেন।
অন্যদিকে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে ইসরায়েল ও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আঘাত হানছে। এর লক্ষ্য অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা তৈরি করা এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের জন্য যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে দেওয়া।
এছাড়া ইরান এখনো তার মিত্র বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করতে পারে—এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ নতুন করে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে, ফলে যুদ্ধ আরেকটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম। ছয় মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। তবে ভবিষ্যতে আরও হতাহতের আশঙ্কাকে ট্রাম্প খুব একটা গুরুত্ব দেননি। এমনকি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ইরান-প্রণোদিত হামলার আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘হয়তো… যেমন বলেছি, কিছু মানুষ মারা যাবে।’
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ বলেন, ‘যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তখনই বাড়বে, যখন আমেরিকানদের আরও বেশি হতাহত হবে। কারণ ইরানও ঠিক সেটাই চাইছে।’
অনেক বিশ্লেষকের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে সামরিক পদক্ষেপের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখানো ট্রাম্প হয়তো ধরেই নিয়েছিলেন যে, ইরান অভিযানও এ বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় চালানো অভিযানের মতোই সহজ হবে।
সেই অভিযানে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে। এতে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান ছাড়াই ট্রাম্প দেশটির বিশাল তেল সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। কিন্তু ইরান অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুসজ্জিত প্রতিপক্ষ, যেখানে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও নিরাপত্তা কাঠামো রয়েছে।
এমনকি খামেনি ও আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে হত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ ‘ডিক্যাপিটেশন’ হামলাও ইরানকে সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি। বরং আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তাদের জায়গায় আরও কট্টরপন্থি নেতারা ক্ষমতায় আসতে পারেন।
এ ছাড়া, আরেকটি বড় প্রশ্ন—বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে ইরান কি বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে ভেঙে যেতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি—একটি সরু সমুদ্রপথ, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। সেখানে ট্যাংকার চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, যা দীর্ঘস্থায়ী হলে গুরুতর অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়লেও ট্রাম্প প্রকাশ্যে উদ্বেগ কম দেখিয়েছেন। তবে তার প্রশাসন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য প্রভাব কমাতে নানা উপায় খুঁজছে।
অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের জশ লিপস্কি বলেন, ‘এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চাপের জায়গা, যা সম্ভবত আগে পুরোপুরি অনুমান করা হয়নি।’
একজন সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ‘যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এত দ্রুত বাড়বে, ট্রাম্পের দল তা পুরোপুরি আন্দাজ করতে পারেনি। কারণ ইরানে হামলার আগে তেলবাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে যথেষ্ট পরামর্শ করা হয়নি।’
হোয়াইট হাউসের আনা কেলি বলেন, ‘ইরানের শাসনব্যবস্থা চরমভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে।’ তবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ওঠা উদ্বেগের বিষয়ে তিনি সরাসরি কিছু বলেননি।
দুই হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা ও প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ এক রিপাবলিকান সূত্র জানায়, কিছু শীর্ষ উপদেষ্টা সতর্ক করলেও ট্রাম্প হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ঐতিহ্যবাহী মিত্রও এতে বিস্মিত হয়েছে। এক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, ‘এটি মূলত একজনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া।’
যুদ্ধ কতদিন চলবে—এটাই এখন সবচেয়ে বড় অজানা বিষয়, যা এর প্রভাব কতটা গভীর হবে তা নির্ধারণ করবে। প্রতিদিন যুদ্ধের ব্যয় বাড়ছে। ট্রাম্প বলেছেন, অভিযান চার বা পাঁচ সপ্তাহ বা ‘যতদিন প্রয়োজন’ ততদিন চলতে পারে, তবে এরপর কী হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা লেফটেন্যান্ট জেনারেল বেন হজেস বলেন, ‘ইরানে মার্কিন সামরিক কৌশল প্রশংসনীয়। তবে রাজনৈতিক, কৌশলগত ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হয় বিষয়টি পুরোপুরি ভেবে দেখা হয়নি।’
ইরান সংকট সামাল দিতে উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর সমর্থন পাওয়াও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব দেশ বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তবে সবাই ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয়। গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে লেখা এক খোলা চিঠিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধনকুবের খালাফ আল হাবতুর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।




