ঢাকা  বৃহস্পতিবার, ২রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামদুই উপজেলা, এক স্বপ্ন: গফরগাঁও উন্নয়ন সমীকরণ

দুই উপজেলা, এক স্বপ্ন: গফরগাঁও উন্নয়ন সমীকরণ

প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী

দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার পর ঐতিহ্যবাহী গফরগাঁও উপজেলা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। সরকারের অনুমোদনের ফলে নতুন দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, জনসেবার সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।

ভৌগোলিক বিন্যাস অনুযায়ী মূল গফরগাঁওয়ে সাতটি ইউনিয়ন এবং নবগঠিত দক্ষিণ গফরগাঁওয়ে আটটি ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ আরও বৃদ্ধি পাবে।

গফরগাঁও থেকে নির্বাচিত মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব আখতারুজ্জামান বাচ্চু এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর উদ্যোগ, প্রচেষ্টা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ফলেই নতুন উপজেলার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে।

বর্তমানে তিনি নতুন উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামো গঠন, উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণ, সরকারি দপ্তর স্থাপন, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, হাসপাতালের মানোন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

একটি নতুন উপজেলা গঠন কেবল একটি প্রশাসনিক ঘোষণা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রক্রিয়া, যার প্রতিটি ধাপই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে সঙ্গে একটি নতুন বাস্তবতাও সামনে এসেছে। মূল গফরগাঁও বা উত্তরাঞ্চলের সাতটি ইউনিয়নের মানুষের মধ্যে উন্নয়নের ভারসাম্য নিয়ে এক ধরনের নীরব উদ্বেগ কাজ করছে।

বিষয়টি প্রকাশ্যে খুব বেশি আলোচিত না হলেও অনেকেই মনে করছেন, দক্ষিণ গফরগাঁও যখন নতুন প্রশাসনিক ভবন, সরকারি বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সুবিধা পাবে, তখন উত্তর গফরগাঁওয়ের জন্য সমমানের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত কীভাবে উন্মোচিত হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনই খুঁজে বের করা জরুরি।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় ২৩ জুলাই ২০২৬ জাতীয় প্রেসক্লাবে “দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের উন্নয়ন : সম্ভাবনা ও করণীয়” শীর্ষক একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের প্রশাসনিক উন্নয়নকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি উত্তর গফরগাঁওয়ের উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন।

বক্তাদের অভিমত ছিল—একই সংসদ সদস্য যখন দুই উপজেলার উন্নয়নের দায়িত্ব পালন করবেন, তখন উন্নয়নের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

সভায় একটি যুগান্তকারী উন্নয়ন ভাবনা উপস্থাপন করা হয়। উত্তর গফরগাঁওকে শিক্ষা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবার একটি আধুনিক আঞ্চলিক কেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্যে একটি লিখিত প্রকল্প প্রস্তাব (Project Proposal) মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব আখতারুজ্জামান বাচ্চুর হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রস্তাবনায় উত্তর গফরগাঁওয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং একটি নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়।

এই প্রস্তাবের পেছনে রয়েছে একটি সুদূরপ্রসারী উন্নয়ন দর্শন। দক্ষিণ গফরগাঁও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হবে, আর উত্তর গফরগাঁও শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। এতে দুই উপজেলার মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা নয়; বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও পরিপূরক উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি হবে।

একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থী, গবেষক ও শিক্ষক এখানে আসবেন। নতুন নতুন গবেষণাগার, প্রযুক্তি উদ্ভাবন কেন্দ্র এবং শিল্প-শিক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে উত্তর গফরগাঁও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির একটি শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

একই সঙ্গে একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে ময়মনসিংহ অঞ্চলসহ আশপাশের জেলার লাখো মানুষ উন্নত চিকিৎসা সেবা পাবে। জরুরি চিকিৎসা, বিশেষজ্ঞ সেবা এবং চিকিৎসা শিক্ষার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এর পাশাপাশি একটি আধুনিক নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে দক্ষ নার্স ও মিডওয়াইফ তৈরির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যখাত আরও শক্তিশালী হবে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও বৃদ্ধি পাবে। স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কেবল নতুন ভবন নির্মাণ নয়; মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই ভিত্তি নির্মাণ। তাই দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের উন্নয়নের পাশাপাশি উত্তর গফরগাঁওকে একটি বিশেষায়িত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যনগরী হিসেবে গড়ে তোলার দাবি সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত।

এখন সময় এসেছে দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে একটি অভিন্ন উন্নয়ন লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, নার্সিং পেশাজীবী, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, প্রবাসী, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ এবং তরুণ প্রজন্ম—সকলের সম্মিলিত উদ্যোগেই এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।

গফরগাঁওয়ের জনগণের প্রতি আহ্বান—উন্নয়নের প্রশ্নে বিভাজন নয়, ঐক্য গড়ে তুলুন। উত্তর ও দক্ষিণ—দুই অংশই গফরগাঁওয়ের অবিচ্ছেদ্য পরিচয়। এক অংশের অগ্রগতি অন্য অংশের ক্ষতির কারণ নয়; বরং সুষম পরিকল্পনার মাধ্যমে উভয় অঞ্চলই সমানভাবে সমৃদ্ধ হতে পারে।

মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব আখতারুজ্জামান বাচ্চুর সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। তিনি কেবল একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবেই নয়, বরং সমগ্র গফরগাঁওয়ের আধুনিক উন্নয়নের স্থপতি হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

আজকের সময়ের দাবি একটাই—সুষম উন্নয়ন, দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং ঐক্যবদ্ধ জনসম্পৃক্ততা। দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের প্রশাসনিক বিকাশ এবং উত্তর গফরগাঁওয়ের শিক্ষা-স্বাস্থ্যভিত্তিক উন্নয়ন—এই দুই ধারার সমন্বয়ই আগামী দিনের সমৃদ্ধ, আধুনিক ও সম্ভাবনাময় গফরগাঁও নির্মাণের সর্বোত্তম পন্থা।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular