সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাবা তখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন। এসএসসি পরীক্ষা চলছিল। ১০ মে সকালে পরীক্ষা ছিল ঋতু খাতুনের। ভোরে হাসপাতালে মারা যান তাঁর বাবা কবির হোসেন। তবে মেয়ের পরীক্ষা নষ্ট হবে ভেবে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বাবার মৃত্যুর খবর জানাননি। ঋতু পরীক্ষা দিতে চলে যাওয়ার পর বাড়িতে আনা হয় বাবার মরদেহ। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে বাবার মৃত্যুর খবর জানতে পারে সে।
বাবাকে হারানোর শোক নিয়েই বাকি পরীক্ষাগুলো শেষ করে ঋতু। সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
ঋতু যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। সে উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের মৃত কবির হোসেন ও রেহেনা খাতুন দম্পতির ছোট মেয়ে। দুই বোনের মধ্যে বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবাকে হারিয়ে এখন উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে মেধাবী এই শিক্ষার্থী।
পরিবার ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ঋতুর বাবা কবির হোসেন দিনমজুরের কাজ করতেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা শুরুর সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন। পরীক্ষা চলাকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গত ১০ মে ঋতুর বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা পরীক্ষা ছিল। ওই দিন ভোররাতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কবির হোসেন। সকালে তাঁর মরদেহ বাড়িতে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু মেয়ের পরীক্ষা থাকায় পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বাবার মৃত্যুর খবর জানাননি।
হাকিমপুর গ্রামের বাড়ি থেকে চৌগাছা শহরের ছারা পাইলট বালিকা বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। ঋতু যথারীতি পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রে চলে যায়। সে কেন্দ্রে যাওয়ার পর বাবার মরদেহ বাড়িতে আনা হয়। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে বাবার মৃত্যুর খবর জানতে পারে ঋতু। শেষবারের মতো বাবার মুখ দেখে বিদায় জানিয়ে আবার পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বসতে হয় তাকে।
বাবাকে হারানোর শোক নিয়েই বাকি পরীক্ষাগুলো শেষ করে ঋতু। ফল প্রকাশের পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সে বলে, বাবা বেঁচে থাকলে তার ফল দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া ও প্রার্থনা চায় সে। একই সঙ্গে বাবার অবর্তমানে নিজের উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে চলবে, তা নিয়েও দুশ্চিন্তার কথা জানায় ঋতু।
হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক শাহানা খাতুন বলেন, ঋতু খুবই মেধাবী। সে ভালো ফল করবে, এমন প্রত্যাশা শিক্ষকদের ছিল। অসুস্থ বাবা এবং পরিবারের আর্থিক সংকটও তার ফলাফলে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
শাহানা খাতুন বলেন, ঋতুর মতো মেধাবী শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা চালিয়ে নিতে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। কোনো শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা করা গেলে তার উচ্চশিক্ষার পথ সহজ হবে।
চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইসলাম বলেন, ঋতুর জিপিএ-৫ পাওয়ার খবরটি খুবই আনন্দের। উপজেলা প্রশাসন তার পাশে থাকবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।




