প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী: জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য এবং এর মাত্র এক বছর আগে একই বিশ্বমঞ্চে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য—দুটি সময়ের, দুটি রাজনৈতিক বাস্তবতার এবং দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির হলেও একটি বিষয়ে তাদের বক্তব্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে: বাংলাদেশকে একটি অধিক গণতান্ত্রিক, মানবিক, অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় যুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে Recovery, Restoration and Reconstruction—‘৩-R’ কৌশল সামনে এনেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হবে। তাঁর ভাষণে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, বিনিয়োগ, তরুণদের কর্মসংস্থান, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক শান্তির বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। �
BSS +1
তারেক রহমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ছিল—“We welcome partnership, innovation and both domestic and foreign investment.” অর্থাৎ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব, উদ্ভাবন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাচ্ছে। �
BSS
অন্যদিকে ২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮০তম অধিবেশনে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে কেন্দ্র করে ‘Three Zeros’—Zero Carbon, Zero Wealth Concentration এবং Zero Unemployment-এর ধারণা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর ভাষায়, “Let the dream of a three-zero world be the dream of all nations united in this Assembly.” �
UN Web TV +1
দুটি বক্তব্য পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য শুধু অভ্যন্তরীণ সংস্কার যথেষ্ট নয়; বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারিত্বও অপরিহার্য।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান কি সত্যিই শক্ত হয়েছে?
এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অবস্থানের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাঁর প্রতি পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং তাঁর সংলাপ, ঐকমত্য ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভিজ্ঞতার প্রশংসা করেছেন। �
The United Nations in Bangladesh
অতএব, বাংলাদেশের কূটনৈতিক দৃশ্যমানতা এখন আগের তুলনায় বেশি। কিন্তু আন্তর্জাতিক মর্যাদাকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করাই হবে পরবর্তী পরীক্ষা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক: সুযোগের দরজা কতটা খুলেছে?
‘মহাশক্তিধর রাষ্ট্র’ বলতে যদি যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো হয়, তাহলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লেখা চিঠিতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং বাণিজ্য, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করেন। �
The Daily Star
আগস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, খাদ্য, ওষুধ এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। মার্কিন পক্ষ থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়। �
The Daily Star +1
এরপর প্রধানমন্ত্রী মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আহ্বান জানান—বিশেষ করে জ্বালানি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, কৃষি, স্বাস্থ্য, উৎপাদন ও লজিস্টিকস খাতে। �
The Business Standard +1
এগুলো থেকে অন্তত এটুকু বলা যায় যে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন কেবল ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধ না থেকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও কর্মসংস্থানের দিকে সম্প্রসারিত করার চেষ্টা চলছে।
তবে এটিকে এখনই পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে ঘোষণা করার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক যোগাযোগকে বাস্তব বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি বৃদ্ধিতে রূপান্তর করাই হবে আসল পরীক্ষা।
বাংলাদেশ কীভাবে এগোতে পারে?
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বাস্তবসম্মত বহুমাত্রিক কূটনৈতিক রূপরেখা থাকা প্রয়োজন।
প্রথমত—বিনিয়োগ কূটনীতি। যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোর বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাস, বন্দর, করব্যবস্থা, জমি, ব্যাংকিং ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পূর্বানুমেয় পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত—প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি। শুধু বিদেশি বিনিয়োগ নয়, সেই বিনিয়োগের সঙ্গে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও বাংলাদেশি তরুণদের প্রশিক্ষণ যুক্ত করতে হবে।
তৃতীয়ত—স্বাস্থ্য ও শিক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্রের সঙ্গে নার্সিং, চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, বায়োটেকনোলজি, জনস্বাস্থ্য ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব তৈরি করা যেতে পারে।
চতুর্থত—জ্বালানি নিরাপত্তা। বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি হলো নির্ভরযোগ্য জ্বালানি। তাই LNG-এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, গ্রিড আধুনিকায়ন ও জ্বালানি দক্ষতায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
পঞ্চমত—রোহিঙ্গা সংকট। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে নিয়ে মিয়ানমারে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ আরও জোরদার করা দরকার। প্রধানমন্ত্রী তাঁর জাতিসংঘ ভাষণেও নয় বছরের বেশি সময় ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। �
BSS
ষষ্ঠত—তরুণদের জন্য ‘৩-R’ ও ‘৩-শূন্য’কে একসূত্রে আনা। তারেক রহমানের Recovery–Restoration–Reconstruction এবং ইউনূসের Zero Carbon–Zero Wealth Concentration–Zero Unemployment ধারণাকে রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে নয়, বরং কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সবুজ অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবসার বাস্তব কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিশ্বমঞ্চের হাত বাংলাদেশ কতটা নিজের ঘরে আনতে পারবে?
এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের দৃশ্যমানতা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে নতুন যোগাযোগ হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নিরাপদ অভিবাসন ও অর্থনৈতিক সুযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা, জলবায়ু, শান্তিরক্ষা ও উন্নয়ন ইস্যুতে বাংলাদেশের বক্তব্যেরও একটি স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে। �
The Business Standard +1
কিন্তু কূটনৈতিক হাত মেলানো আর অর্থনৈতিক পরিবর্তন এক জিনিস নয়।
নিউইয়র্কের জাতিসংঘ ভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যতটা মর্যাদার সঙ্গে দাঁড়াবেন, সেই মর্যাদার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে হবে ঢাকার বাজারে, শিল্পকারখানায়, হাসপাতাল-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে এবং তরুণদের কর্মসংস্থানে।
অধ্যাপক ইউনূসের ‘৩-শূন্য’ বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি ধারণা দেয়; প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘৩-R’ রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি বর্তমান রাজনৈতিক-প্রশাসনিক কাঠামো তুলে ধরে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো—এই দুই ধরনের চিন্তার মধ্য থেকে বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি তৈরি করা।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ আজ আগের চেয়ে দৃশ্যমান। এখন প্রয়োজন সেই দৃশ্যমানতাকে বিনিয়োগে, বিনিয়োগকে কর্মসংস্থানে, কর্মসংস্থানকে মানুষের আয়ে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শক্তিতে রূপান্তর করা।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে শুধু নিউইয়র্কে কে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ালেন তা দিয়ে নয়; বরং বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে বিশ্বশক্তিগুলোর সহযোগিতাকে নিজের মানুষের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারল—তার ওপর।
**জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান আজ একটি নতুন সুযোগের দরজা খুলেছে। এখন সেই দরজা দিয়ে বাংলাদেশ কতটা উন্নয়ন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দেশে ফিরিয়ে আনতে পারে—সেটিই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।**
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ: তারেক রহমানের “৩-R”, ইউনূসের “৩-শূন্য” এবং পরাশক্তির সঙ্গে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ।
RELATED ARTICLES




