ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅর্থনীতিমজুরি বিক্ষোভে অস্থির পোশাক খাত, বৈঠকে মজুরি বোর্ড

মজুরি বিক্ষোভে অস্থির পোশাক খাত, বৈঠকে মজুরি বোর্ড

নিউজ ডেস্ক: বেতন বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের টানা আন্দোলনের মধ্যে দেশের তৈরি পোশাক খাতের মজুরি কাঠামো পর্যালোচনায় প্রথম বৈঠকে বসছে নবগঠিত মজুরি বোর্ড।

বুধবার (৪ নভেম্বর) বোর্ডের এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে আন্দোলনের পঞ্চম দিনেও ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতির কারণে শত শত কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। অর্থাৎ বিদ্যমান মজুরির তুলনায় প্রায় ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছেন তাঁরা। খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধির কারণে বর্তমান বেতনে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত শ্রমিকেরা।
বুধবার ঢাকার উপকণ্ঠের অন্যতম দুই পোশাকশিল্প কেন্দ্র সাভার ও গাজীপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় কয়েকটি কারখানা উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত রাখে।
শ্রমিকদের আন্দোলন প্রশমিত করতে সরকার ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডে শ্রমিক ও কারখানার মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সরকারের একজন প্রতিনিধি ও একজন নিরপেক্ষ সদস্য রয়েছেন। এর দায়িত্ব হচ্ছে পোশাকশিল্পের বিদ্যমান মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা করে নতুন মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করা।
শ্রমিকদের প্রত্যাশা, নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বর্তমান বাজারদর, মূল্যস্ফীতি এবং পরিবারের ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। তাঁদের মতে, শুধু মজুরি পর্যালোচনার ঘোষণা নয়, দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্তও প্রয়োজন।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার এর আগে বলেছেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের মজুরি বিশ্বের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। মালিকেরা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দিতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিয়ে আলোচনা করা উচিত বলেও মত দিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কর্মরত। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে এ শিল্প থেকে। একই সঙ্গে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) খাতটির অবদান প্রায় ১০ শতাংশ। চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ।
এই শিল্পের পণ্য রপ্তানি হয় এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্সের জারা, ওয়ালমার্টসহ বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডের কাছে। ফলে দেশের শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক অসন্তোষ ও উৎপাদন ব্যাঘাত আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে বসন্ত ও গ্রীষ্ম মৌসুমের পোশাক তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন সময়ে এ ধরনের অস্থিরতা রপ্তানি চালানের সময়সূচি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন।
সুইডিশ পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএম জানিয়েছে, কিছু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও তাদের সরবরাহব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে পোশাক কারখানার মালিকেরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় শিল্পটি আগে থেকেই চাপে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ সমস্যা এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিও উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এক ধাপে ব্যাপক মজুরি বৃদ্ধি কারখানাগুলোর আর্থিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন মালিকপক্ষ।
এর আগে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান শ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনার জন্য গঠিত বোর্ডকে কাজ করার সুযোগ দিতে আন্দোলনকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে আন্দোলন অব্যাহত থাকলে শ্রম আইন অনুযায়ী ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’ নীতি প্রয়োগের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
মজুরি বৃদ্ধি ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ভারসাম্য জরুরি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হানের মতে, কারখানাগুলো উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারলে উল্লেখযোগ্য মজুরি বৃদ্ধির পরও বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব। তবে মজুরি নির্ধারণে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কারখানাগুলোর অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। পণ্যের ন্যায্য মূল্য ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় যৌক্তিক পরিবর্তনের মাধ্যমে শ্রমিকদের উন্নত কর্মপরিবেশ এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে ক্রেতাদের সহযোগিতা করা উচিত।
সেলিম রায়হানের মতে, মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক অসন্তোষ শিল্পের জন্য আরও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। কারণ উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাঁর ভাষায়, সস্তা শ্রমকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার কৌশল হিসেবে ধরে রাখা ঠিক হবে না। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে উৎপাদনশীলতা, নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।-

সব মিলিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং পোশাকশিল্পের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক থেকে কী ধরনের আলোচনা ও সিদ্ধান্তের পথ তৈরি হয়, তার ওপর নির্ভর করছে চলমান সংকট নিরসনের পরবর্তী অগ্রগতি।

আরো পড়ুন: মজুরি আন্দোলনে হুমকির মুখে পোশাক শিল্পের স্বল্প-খরচ সুবিধা

আরো খবর
Continue to the category
- Advertisment -spot_img

Most Popular