ঢাকা  শনিবার, ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ৬ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশকক্সবাজারবৈষম্য বন্ধে ও প্রতিনিধি নিয়োগে পার্বত্য চট্টগ্রামে বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর ৮ দফা

বৈষম্য বন্ধে ও প্রতিনিধি নিয়োগে পার্বত্য চট্টগ্রামে বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর ৮ দফা

নিজস্ব প্রতিবেদক: পার্বত্য চট্টগ্রামে বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য বন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদসহ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে মঙ্গলবার (৮ জুলাই ২০২৫) জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বড়ুয়া সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি। এ সময় সংগঠনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ভদন্ত অদিতানন্দ মহাথোরো প্রধান উপদেষ্টা।-কেন্দ্রীয় সংগঠক ত্রিদিব বড়ুয়া টিপু, শিক্ষক প্রকাশ কুসুম বড়ুয়া, ধীমান বড়ুয়া, জিনপদ বড়ুয়া, শ্যামল চৌধুরী, সমু বড়ুয়া ,অপু বড়ুয়া। জেলা সংগঠক, দেবাশীষ বড়ুয়া ,নিপ্পন বড়ুয়া, জুয়েল বড়ুয়া,পলাশ বড়ুয়া,রুবেল বড়ুয়া ,অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক নির্মল বড়ুয়া। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন সংগঠনের অন্য নেতৃবৃন্দ।

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সমান অধিকারের স্বীকৃতি থাকলেও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া বড়ুয়া জনগোষ্ঠী এখানে নানা রকম বৈষম্যের শিকার। সংবিধানের নির্দেশনা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সরকারের উচিত এরূপ বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গ্রহণ করা। এদেশে বড়ুয়া জনগোষ্ঠী মোট জনগোষ্ঠীর কত শতাংশ তার সঠিক কোন সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব বা শুমারি নেই। গণশুমারিতে বড়ুয়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আলাদাভাবে তথ্য উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

তারা বলেন, অধিকার সংরক্ষণ এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তরফ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ঢারি খন্ড (ক,খ,গ,ঘ) সম্মিলিত ভাবে ১৯৯৭ সালে ২রা ডিসেম্বর চুক্তি করা হয়।

চুক্তির পর ২৭ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের বসবাসরত বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা প্রতিটি স্তরে স্তরে বৈষম্যের শিকার । পার্বত্য চুক্তি বা শান্তি চুক্তির ফলে ২৭ বছর ধরে পাহাড়ের বাঙ্গালিরা (মুসলমান, হিন্দু ও বড়ুয়া) চরম ভাবে বৈষম্যের শিকার।

স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলের তিনটি উপজাতি জনগোষ্ঠীকে এককভাবে সুবিধা করে দিয়েছে। এতে শুধু সম্প্রদায় ও জাতিগত বৈষম্যই হচ্ছে না, দেশের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলমান, হিন্দু ও বড়ুয়া নাগরিককে যোগ্য মানব সম্পদে পরিণত করে দেশ ও জাতি গঠনের কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে বিশাল ধরনের বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ চুক্তিতে রাঙামাটি ঢাকনা, খাগড়াছড়ি ত্রিপুরা ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা মারমাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।

এখানে আরো পরিষ্কার করে যদি বলা হয়, ঢাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সদস্য ব্যতীত মুসলমান, বড়ুয়া, হিন্দু, তনচঙ্গা, সাঁওতাল, অহমিয়া, গুর্খা, কুকি, পাংখোয়া, লুসাই (মিজু), ঢাক, খুমি, খিয়াং ও য়ো জনগোষ্ঠীর সদস্যদের পিছিয়ে রাখা হয়েছে।
পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে মুসলমান, বড়ুয়া ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর সদস্যদের বাঙ্গালি জনগোষ্ঠী তফসীল ভুক্ত করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে মুসলমান ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হলেও বিগত ২৭ বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর কোন প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। চুক্তির পর গঠন করা হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মূল্যায়ন কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তাকারী উপদেষ্টা কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ইত্যাদি গঠন করা হয় সংখ্যায় কম-বেশী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হলেও এসব কমিটিতে এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে রাখা হয়নি বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর কোন প্রতিনিধি ।

তারা আরো বলেন, পার্বত্য চুক্তির পর আঞ্চলিক পরিষদ, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানগণের সাথে বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বৈঠক করা হয় অন্য সকল জনগোষ্ঠীর ন্যায় বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর আঞ্চলিক পরিষদ, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের কমপক্ষে ১জন করে প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য, তারা কেবল প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানগণ এবং সিনিয়র রাজনৈতিক নেতারা, তারা তাদের দেয়া কথা রক্ষা করেনি। নির্গত স্বৈরাচারের শাসনকালিন ১৭ বছর ধরে পাহাড়ে বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর কিছু পদলেহনকারী স্বঘোষিত নেতার কারণে বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কথা বলা সুযোগ পর্যন্ত ছিলো না।

স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ১৭ বছরে ক্ষমতায় থাকাকালিন তার দলীয় লোকজন বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর ওপর যে নির্যাতন চালিয়েছে তার সংক্ষিপ্ত চিত্র : বাড়ি-ঘর ভাংচুর,ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান ভাংচুর, রাঙামাটি – ঢাকা রোডে সেন্টমার্টিন পরিবহনের ব্যবসাটি কেড়ে নেয়া, রাঙামাটিতে সত্য সংবাদ প্রকাশ করায় উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে তথ্য প্রযুক্তি আইনে ৫৭ (২) ধারায় একাধিক মামলা দায়ের করে হয়রানি করা হয়।

রাঙামাটির ভেদ ভেদী বাজারে মৃত রুহিনী বড়ুয়ার জায়গাতে জোর পূর্বক দখল করে রাসেল স্মৃতি সংসদ নামে আওয়ামীলীগের অফিস ঘর নির্মাণ করে এবং রাঙামাটি পৌরসভার নাম দিয়ে মৃত রুহিনী বড়ুয়ার জায়গাতে ভেদ ভেদী পৌর কাঁচা বাজার নির্মাণ করে আওয়ামীলীগ ।

৫ জুন-২০১৭ রাঙামাটি জেলখানার সামনে থেকে চট্ট-মেট্রো ১৩৪৪৬৫ নম্বরের একটি হাইয়েস গাড়িতে র্যা ব-৭ এর তৎকালিন মেজর ফাহিম এর নেতৃত্বে বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর সদস্যকে অপহরণ করে সিলেটের চুনারুঘাট থানার সাতছড়ি জঙ্গলে চোখবাঁধা অবস্থায় ছেড়ে দেয়া হয়। ২০১৭ সালে র্যা পিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যা ব) এর মহাপরিচালক ছিলো ড.বেনজির আহম্মদ।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি-২০২৪ ইংরেজি তারিখ রাতে রাঙামাটি পৌরসভার ০৯ নং ওয়ার্ডের উলুছড়ি (আলুটিলা) এলাকায় বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর সদস্যর বাগান বাড়িতে আওয়ামীলীগের মদদে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

বর্তমান বৈষম্য বিরোধী চেতনাকে ধারণ করা অন্তবর্তীকালীন সরকার কর্তৃক নতুনভাবে গঠিত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে পূর্বের ন্যায় বৈষম্য অব্যাহত রয়েছে। যা বর্তমান সরকারের বৈষম্য বিরোধী চেতনা বিরোধী এবং জাতীর কাছে কোনভাবে কাম্য নয়।
রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চাকুরী ও শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের ক্ষেত্রে বাঙালিদের জন্য ৩০ শতাংশ ও নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের জন্য ৭০ শতাংশ বরাদ্দ নীতি অবলম্বন করছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বড়ুয়া সংগঠন এর দাবি :
(১) পার্বত্য চুক্তিটি সংশোধনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ সহ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা।
(২) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মূল্যায়ন কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তাকারী উপদেষ্টা কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এর বোর্ড সভায়, তিন পার্বত্য জেলা প্রশাসনে আইন শৃংখলা কমিটিতে, তিন পার্বত্য জেলার ২৬টি উপজেলা প্রশাসনে আইন শৃংখলা কমিটিতে, তিন পার্বত্য জেলার পৌরসভার শহর উন্নয়ন কমিটিতে বিশেষ বিবেচনায় বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা।
(৩) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ এর শুমারির তথ্যে অধ্যায় ৩ রাঙামাটি জেলার শুমারির ফলাফল ৩.১.৪ এর ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যা ছকে বা খানায় বৌদ্ধ বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর সদস্যদের পরিচিতি আলাদা ভাবে উল্লেখ করা
হয়নি।
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ এ শুমারি সম্পর্কিত অধিকতর তথ্য-উপাত্ত আলাদাভাবে ঢুকে বা খানায় বৌদ্ধ “বড়ুয়া” জনগোষ্ঠীর পরিচিতি সংযুক্ত করা ।
(৪) রাষ্ট্রীয় ভাবে বৌদ্ধ “বড়ুয়া” জনগোষ্ঠীর সদস্যরা বৈষম্যের শিকার বিধায় তিন পার্বত্য জেলা বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে সংসদ সদস্য পদ সংরক্ষিত করে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ করে দেয়া।
(৫) বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি হিসাবে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা থেকে বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা।
(৬) ঢাকার বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বসবাসরত অন্য সকল জনগোষ্ঠীর ন্যায় বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর ছাত্র-ছাত্রীদের এবং সদস্যদের সকল সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেয়া।
(৭) রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী জাতীয় দিবস এবং শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের সাথে সাক্ষাৎকালিন পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বসবাসরত বড়ুয়া জনগোষ্ঠীর সদস্যদের নিজস্ব সংগঠনের মাধ্যমে উল্লেখিত দিবসে আমন্ত্রণ জানানো। চলমান পাতা-০৫

(৮) বৈষম্য বিলোপ কমিশন চাই ।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular