রূপম ভট্টচার্য্য-চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের প্রবেশ পথেই কয়েকশ দোকান। ওয়াকওয়েতে দাঁড়িয়েসমুদ্রপানেতাকালেমনেহবেপাড়া-মহল্লার কোনোবস্তিদর্শনার্থীদেরবসার জন্য যেখানে ছিল রঙ-বেরঙের ব্লক; সেই ব্লকের ওপরেও তৈরি হয়েছে দোকান। আর এসব দোকান ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলছে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বাণিজ্য। গত ৫ আগস্টের আগে এসব দোকানের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের হাতে। তবে ক্ষমতার পট পরিবর্তনে এখন সেই অবৈধ দোকানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বিএনপির নেতাকর্মীরা।
ছুটির দিন কিংবা অবসরে নগরের বিভিন্ন প্রান্তে থেকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে যান হাজারো পর্যটক। সৈকতের সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে তারা ফিরে আসেন তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে। অধিকাংশ পর্যটকের অভিযোগ তারা সৈকতে কেবল প্রশান্তির খোঁজে যান। তবে সেখানে গিয়ে এমন সারি সারি দোকানের ভিড়ে তারা আসল সৌন্দর্যই উপভোগ করতে পারেন না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতা হারাবার আগে এসব দোকানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগসহ সভাপতি মাসুদ করিমের হাতে। প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে ভুঁইফোড় ‘পতেঙ্গা সমুদ সৈকত হকার ক্যামেরাম্যান শ্রমজীবী সমবায় লিমিটেড’সমিতির ব্যানারে দৈনিক দোকান ভেদে ১শ’ থেকে ৩শ’ টাকা তুলতেন তিনি। তার অধীনে ছিলএকটি সিন্ডিকেট। এছাড়া মাসুদের বাবা নুর মোহাম্মদ এবং ওয়াহিদুল আলম ওরফে ওয়াহিদ মাস্টার ও এসব চাঁদার ভাগ পেতেন।
মাসুদ করিম মূলত চট্টগ্রাম-১১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ লতিফের মদদপুষ্ট ছিলেন। সাবেক এই এমপির প্রশ্রয়েই পতেঙ্গা জুড়ে চলতো মাসুদের অত্যাচার। গত ১৯ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গা এলাকা থেকে পতেঙ্গা থানায় হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় মাসুদকে গ্রেপ্তার করে পতেঙ্গা থানা পুলিশ।
সম্প্রতি পতেঙ্গা সমুদ সৈকত এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, পতেঙ্গা সৈকতের মূল পয়েন্ট থেকে বালুচরে দিকে নামতে ওয়াক ওয়েতে রয়েছে নৌকা, দোলনাসহ ৮ থেকে ১০টি রাইড। এছাড়া পতেঙ্গা সৈকত ঘেঁষা‘চিটাগংসিটি আউটার রিং রোড’নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে সৈকতের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য লাগানো ফুলের গাছ ও বাগান নষ্ট করে তৈরি করা হয়েছে অন্তত পাঁচ শতাধিক দোকান।
সৈকতের মূল পয়েন্ট থেকে সৈকতে নামতে ওয়াকওয়ের দুইপাশের প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার জুড়ে খাবার, খেলনা, ঝিঁনুক, চা, আচার, কসমেটিক্সসহ নানা ধরনের শতশত দোকান। এসব দোকান ত্রিপল, বাঁশ এবং টিন দিয়ে তৈরি করা। আর এসবের ফলে শ্রী হারিয়েছে সমুদ পাড়। দোকানগুলোর ফলে সংকীর্ণ হয়ে গেছে দর্শনার্থীদের হাঁটা চলার পথ।
এদিকে, সমুদ পাড়ের রেলিংয়ের সামনে বসানো হয়েছে রঙ-বেরঙের চেয়ার। সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য লাগানো ফুলের গাছ ও বাগান নষ্ট করে গড়ে ওঠা দোকানের দোকানিরাই বসিয়েছেন এসব চেয়ার। সেখানে খাবার অর্ডার করা ছাড়া বসতে দেওয়া হয় না দর্শনার্থীদের। পর্যটকদের বসার জন্য সিমেন্ট দিয়ে যেসব রঙ-বেরঙের ব্লক তৈরি করা হয়েছিল সেসব ব্লক দখল হয়ে গেছে দোকানের বর্ধিত স্থাপনায়।
ডবল মুরিং এলাকা থেকে সৈকতে দুইশিশুসহ বেড়াতে আসা লাবণী আক্তার নামে এক পর্যটক বলেন, ‘বন্ধের দিনে বাবুদের নিয়ে ঘুরতে এসেছি। বন্ধের দিনে একটু নির্মল হাওয়ার জন্য সমুদ্র সৈকতই শ্রেষ্ঠ পর্যটন কেন্দ্র। কিন্তু এখানে অনেক বছর ধরেই দোকানপাটেভরে গেছে। আগেকিন্তু এমনছিলনা। আগে সব দোকানছিলমূলসড়কেরদিকে। আর সমুদ্রছিল খোলামেলা।’
পার্শ্ববর্তীকাটগড়এলাকা থেকে ঘুরতেযাওয়া সোহাগনামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় যেভাবে সৈকত দেখেছিএখন সেরকম নেই। এখনপুরো সৈকত দখলকরেবাণিজ্য করার পাঁয়তারাকরছেরাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। এক দল গিয়েএখনআরেক দল খাচ্ছে। কিন্তু পতেঙ্গা বীচেরবিষফোড়াএসব দোকান উচ্ছেদ হচ্ছেনা। আমাদের স্থানীয়রাওভাগ-বাটোয়ারার দ্ব›েদ্ধ ব্যস্ত। এগুলোপ্রশাসন দেখে না। কারণতাদেরপকেটেওটাকার অংশ যায়।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামীলীগসরকারপতনের পর দোকানগুলো থেকে চাঁদা নেওয়া না হলেও রাইডগুলো থেকে প্রতিসপ্তাহে ৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। আগে এই চাঁদার টাকার টাকার ভাগ স্থানীয়আওয়ামীলীগ নেতা, থানাপুলিশএবংট্যুরিস্ট পুলিশেরপকেটে গেলেও এখন সীমাবদ্ধ বিএনপির গুটি কয়েক নেতাকর্মীদের মধ্যে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পতেঙ্গা থানা কৃষক দলের সভাপতি নাছির, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল, থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহাবুদ্দিন, সদস্য নেজাম বর্তমানে পতেঙ্গা সৈকতের অবৈধ দোকান বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। আর তারা সবাই নগর কৃষকদলের আহ্বায়ক মো. আলমগীরের অনুসারী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেন। এদের মধ্যে ইসমাইল সৈকত নিয়ন্ত্রণের মূলহোতা। ইসমাইলের সৈকতে কাঁকড়া এবং মাছের ব্যবসা রয়েছে। আর প্রায় সন্ধ্যার পর তার দোকানেই এই সিন্ডিকেটের মিটিং হয়।
অন্যদিকে, বর্তমানে পতেঙ্গা সৈকতের এসব অবৈধ দোকান বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ মো. আলমগীরের অনুসারি হিসেবে পরিচিতদের কব্জায় হলেও এসব দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ডেইল পাড়া এলাকায় আরেক বিএনপি নেতা পরিচয় দানকারী আলী আজম। আলমগীর গ্রুপের সাথে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত কেন্দ্রিক বিভিন্ন অবৈধ বানিজ্য নিয়ে আলী আজম গ্রুপের সাথে দ্বন্দ্বে ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত ১ অক্টোবর দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে জাহাজে চাঁদা বাজিকে কেন্দ্র করে।
পতেঙ্গা থানা বিএনপি’র সভাপতি নুরুল আবছার বলেন, ‘আমি ৫ আগস্টের পর সৈকতে গিয়ে সবাইকে বলে এসেছি কেউ চাঁদা চাইলে তাকে বেঁধে রাখবেন আপনারা। আমি যতটুকু জেনেছি, নগর কৃষক দলের আহ্বায়ক আলমগীর গ্রুপএবং ডেইল পাড়ার বিএনপির আজম গ্রুপ ওখানে নিয়ন্ত্রণ নিতে চাচ্ছে। আর এসব নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। তবে আজমের পদ-পদবি নেই। আমি এসবের প্রতিবাদও করেছি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নগর কৃষক দলের আহ্বায়ক মো. আলমগীর বলেন, আমার নাম করে চাঁদাবাজির সুযোগ নেই। আমি উল্টো সৈকতের সব দোকানি কেবলে দিয়েছি যেন কেউ চাঁদা চাইলে আমাকে জানায়। আর আগে যারা চাঁদাবাজি করতো তাদেরকেও উচ্ছেদ করে দেওয়া হয়েছে। কেউ আমার নাম করে চাঁদা নিয়েছে এমন প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকব্যবস্থা নেব।’
পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমি এখন পর্যন্ত পতেঙ্গা সৈকতে চাঁদাবাজির কোনো অভিযোগ পাইনি। সৈকতের জায়গা মূলত সিডিএ’র। তাদেরকে বারবার বলা হচ্ছে অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করতে। আমরা তাদের উচ্ছেদ কার্যক্রমের সময় সাহায্য করবো আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়। কেউ উচ্ছেদের উদ্যোগ নিচ্ছে না। এগুলো অবৈধ সব। উচ্ছেদ করে দিলেই ঝামেলা শেষ।’
‘নতুন কোনো চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটলে কেউ অভিযোগ করলে তাকে আমরা গ্রেপ্তার করে চাঁদাবাজির মামলা রুজু করে ব্যবস্থা নেব। আইনগতভাবে এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।’ যোগ করেন ওসি।
অবৈধ দোকান পাট উচ্ছেদের বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘আমাদের নতুন চেয়ারম্যান মহোদয় এসেছেন ওনাকে জানানো হয়েছে। উচ্ছেদের জন্য ইতিমধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে আজ থেকে দুইমাস আগে। পুলিশ সদস্যের সংকট ছিল বলে উচ্ছেদ করা যায়নি। আগামী সপ্তাহে হয়তো উচ্ছেদের প্ল্যান নেওয়া হতে পারে।’
দলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে কালকেই আলাপ করেছি। এক দখলদার গিয়েছে, আরেক দখলদার এসেছে। এজন্য আমাদের দ্রুত উচ্ছেদ করতে হবে। এটা আমি চেয়ারম্যান মহোদয়কে প্রথম দিনেই ব্রিফ দিয়েছি। তিনিও এ বিষয়ে একমত হয়েছেন।’
এদিকে, পতেঙ্গা সৈকতের দোকানগুলোকে সী সাইড থেকে সরিয়ে কান্ট্রি সাইডে স্থানান্তর করাসহ পতেঙ্গাকে পর্যটক বান্ধব জোন হিসেবে গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। আজ বৃহস্পতিবার সৈকতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটন উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট কার্যাবলী সমন্বয়ের জন্য পতেঙ্গা সীবিচের ব্যবসায়ীদের সাথে চট্টগ্রাম বিচম্যানেজমেন্ট কমিটির সভায় তিনি এমন কথা বলেন।
তিনি বলেন, পতেঙ্গা সী বিচকে দৃষ্টিনন্দন করতে বিচম্যানেজমেন্ট কমিটি কর্তৃক মহাপরিকল্পনা নেয়াহয়েছে। পর্যটকদের সমুদ্রের সৌন্দর্য আকৃষ্ট করতে বিচের দোকানগুলোকে সী সাইড থেকে সরিয়ে কান্ট্রি সাইডে স্থানান্তর করাসহ পতেঙ্গাকে পর্যটকবান্ধব জোন হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ডিসি পার্ক থেকে পতেঙ্গা সীবিচ পর্যন্ত পুরো এলাকাটিকে বিশ্বমানের পর্যটন জোন হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, পর্যটকদের সুবিধা সম্বলিত অবকাঠামো নির্মাণ, সৈকতের দোকানসমূহ সুশৃঙ্খল ও পুনর্বাসন করা, টয়লেট, শৌচাগার, চেঞ্জিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণ, ফটোগ্রাফারসহ বিভিন্ন সেবাপ্রদানকারীদের সংখ্যা নির্দিষ্টকরণ, সাময়িক পরিচয় পত্র প্রদান, সেবামূল্য নির্ধারণ, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য ট্যুরিস্ট পুলিশের অফিস নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণ ও বিচ সংশ্লিষ্ট এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনয়ন করা হবে।



