নিউজ ডেস্ক: ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেছেন, ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে ভূমি সেবা প্রোভাইডারদের গতিবিধি মনিটরিং করা হবে।
গতকাল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী ‘ভূমিসেবা মেলা ২০২৬’-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা সেবা প্রদানকারীদের বারবার জনসেবা প্রদানের বিষয়ে সচেতন করেছি। এখন আমাদের দেখা উচিত জনসেবা ঠিকমতো নিশ্চিত হচ্ছে কী না। এজন্য আমরা একটি ড্যাশ বোর্ড তৈরি করেছি। ড্যাশ বোর্ডটি ‘ভূমি দৃষ্টি’ নামে ভূমি সেবা প্রদানকারীদের গতিবিধি মনিটরিং করবে, যা ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, এই ‘ভূমি দৃষ্টি’ অ্যাপটি প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হবে। এর মাধ্যমে দায়িত্বশীল সেবকদের ট্র্যাকিং সিস্টেমের আওতায় আনা হবে। তিনি এর কার্যপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে বলেন, অফিসগুলোর কার্যাবলী জিও লোকেটরিভাবে আমরা স্পট তৈরি করেছি। যখনই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জিও লোকেটরি করা মোবাইল ফোন নিয়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি সেবা প্রদান এলাকায় ঢুকবেন তখনই ‘ভূমি দৃষ্টি’ অ্যাপটিতে সবুজ সংকেত জ্বলে উঠবে। আবার যখনই ভূমি সেবা প্রদানকারী কর্মকর্তা ঐ জিও লোকেটরি এলাকা ত্যাগ করবেন তখন অ্যাপটিতে লাল বাতি জ্বলে উঠবে। এভাবেই আমরা সেবা প্রদানকারীর সেবা প্রদানের মান নির্ণয় ও মনিটরিং করতে পারব। এর মাধ্যমে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অফিসে সেবা প্রদানকারীদের উপস্থিতি ও সেবা প্রদান কার্যক্রম সম্পর্কে অধিকতর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মীর হেলাল উদ্দীন আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টা হচ্ছে সমাজের সুবিধাবঞ্চিতদের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। প্রান্তিক পর্যায় থেকে ভূমি সংক্রান্ত দুর্নীতিগুলোকে কমিয়ে এনে জনসেবা নিশ্চিত করতে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কৃষি জমি, বনের জমি ও জলাশয় কোনো সম্পদকেই বিনষ্ট হতে দেওয়া হবে না। ল্যান্ড জোনিং পদ্ধতিতে স্ব-স্ব জোন নির্ধারণ করে এসকল সম্পদকে সুরক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং এই ল্যান্ড জোনিং কার্যক্রমই রিজার্ভ ফরেস্টগুলো বেদখল হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। এছাড়াও ভূমি মামলা মোকদ্দমা কমিয়ে আনার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
ভূমি মন্ত্রণালয় এবার ভূমি মেলার আয়োজন করে গণমানুষের সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গুটিকয়েক দুষ্টু ও অনৈতিক কাজের সাথে জড়িতদের কারণে পুরো ভূমি ব্যবস্থাপনাকে কোনোভাবেই বদনামের সম্মুখীন হতে দেওয়া হবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে কোনো সময়ই মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়; এজন্য আমাদের চিন্তাধারার মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে, আমাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক ধারার পরিবর্তন আসতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন আরো জানান, বর্তমানে দেশের ১৯৩টি ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ নামমাত্র ফি দিয়ে অনলাইন ভূমিসেবা গ্রহণ করতে পারছেন। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও ডিজিটাল সেবার আওতায় আসছে। ভূমি সংক্রান্ত অধিকাংশ লেনদেন ইতোমধ্যে ই-পেমেন্ট ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। পাশাপাশি কৃষিজমি ও বনভূমি সংরক্ষণে ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে ভূমির শ্রেণি অনুযায়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ভূমি খাতে দুর্নীতি কমানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেবা সহজীকরণ এবং দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে ভূমিসেবাকে আরো আধুনিক, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করা হবে।
ভূমিসেবা মেলার এবারের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল-‘জনবান্ধব অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনা, সুরক্ষিত ভূমি, সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ’। অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী ১০ জন ভূমিহীনকে কৃষিখাসজমি বন্দোবস্তের কবুলিয়ত ও সেবা প্রত্যাশীদের হাতে খতিয়ান এবং মেলা উপলক্ষে আয়োজিত কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মাঝে পুরস্কার ও সনদপত্র তুলে দেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সভাপতিত্বে ও বাকলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিফাত বিনতে আরার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মোঃ মনিরুজ্জামান ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক-অর্থ ও প্রশাসন) মোঃ ওয়াহিদুল হক চৌধুরী। বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ সাখাওয়াত জামিল সৈকত। অনুষ্ঠানে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেবাগ্রহীতা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত তিনদিনব্যাপী ভূমিসেবা মেলায় মোট ১২টি স্টলে ভূমি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সেবা প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে ভূমিসেবা সংশ্লিষ্ট আবৃত্তি এবং ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা পরিবেশন করা হয়।




