সৈয়দা নার্গিস
আধুনিক ক্রিয়েটর ইকোনমির বিশাল পরিধি সঠিকভাবে তুলে ধরা কঠিন। ইউটিউব একটি সাধারণ ভিডিও-শেয়ারিং ওয়েবসাইট থেকে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা লক্ষ লক্ষ পূর্ণকালীন ব্যবসা, শিক্ষাবিদ এবং বিনোদনকারীদের সহায়তা করে।
আয়ের উৎস: বিশ্বব্যাপী ২০০ কোটির বেশি মানুষ নিয়মিত ইউটিউবে ভিডিও দেখেন। প্রত্যেক মিনিটে এই প্ল্যাটফর্মে ৫০০ ঘণ্টা ভিডিও স্ট্রিম হয়। ইউটিউব এখন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, আয়ের অন্যতম মাধ্যম ইউটিউব।
জনপ্রিয় এই ভিডিও প্ল্যাটফর্ম থেকে ব্লগাররা মাসে কয়েক লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত রোজগার করে থাকেন। বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে অনেক ছেলেমেয়ে টাকার মুখ দেখেছে। চাইলে আপনিও শুরু করতে পারেন। ঘরে বসেই মাসে ইনকাম করতে পারবেন লাখ লাখ টাকা। তাহলে জেনে নিন ইউটিউব থেকে আয় করার সেরা কিছু উপায়-
প্রতিযোগিতা: ইউটিউব থেকে আয় করতে আপনাকে কড়া প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হবে। প্রথমেই আপনার ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে স্থায়ী দর্শক তৈরি করতে হবে। তবেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন। প্রথমেই আপনাকে কিছু বিষয়ে নজর দিতে হবে। শুধু ভিডিও আপলোড করলেন আর আয় করে ফেললেন বিষয়টা মোটেই এমন নয়। এজন্য আপনাকে নানান বিষয় বুঝে শুনে কাজ করতে হবে। পার করতে হবে কয়েকটি রুলস এবং ফর্মালিটিস।
লক্ষ্য নির্ধারণ: ভিডিও তৈরির আগে আপনার ভিডিও কোন দর্শকদের কাছে নিয়ে যেতে চান তা আগে ঠিক করুন। এরপরে সেই দর্শকদের জন্য ভিডিও তৈরি করে দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। ভিডিও তৈরির আগে উপযুক্ত বিষয় পছন্দ করুন। শুধুমাত্র সেই বিষয়ের উপরেই ভিডিও তৈরি করুন। এর ফলে দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সুবিধা হবে। সেই নির্দিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করুন।
ভালো টুলস: একটি ভালো ক্যামেরা, আলো, মাইক্রোফোন আপনার ভিডিয়োকে আরও প্রফেশনাল লুক দিতে পারে। নিয়মিত ভিডিও পোস্ট করতে হবে। প্রত্যেক ভিডিওর সঙ্গে দিতে হবে কি-ওয়ার্ড। নিজের ভিডিও থেকে সোশ্যাল মিডিয়া ও নিজের ব্লগিং ওয়েবসাইটে ট্র্যাফিক নিতে হবে।
এক হাজার সাবস্ত্রাইবার: ইউটিউব থেকে রোজগারের জন্য চ্যানেলে অন্তত এক হাজার সাবস্ত্রাইবার থাকতে হবে। সাবস্ক্রাইবার প্রতি আপনি কোনো টাকা পাবেন না। তবে যত বেশি সাবস্ক্রাইবার থাকবে রোজগারের সম্ভাবনা ততই বেশি হবে। যেমন ধরুন আপনি যদি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রমোশনাল কাজ করতে চান তবে আপনার চ্যানেলে যত বেশি সাবস্ক্রাইবার থাকবে তত বেশি রোজগার করতে পারবেন।
চার হাজার ঘণ্টা ভিউ: এক হাজার সাবস্ক্রাইবারের সঙ্গেই আয় শুরুর জন্য বিগত ১২ মাসে প্রয়োজন হবে চার হাজার ঘণ্টা ভিউ। যত বেশি ভিউ পাবেন রোজগারের সম্ভাবনা ততই বাড়তে থাকবে। তবে আপনার ভিডিওর উপরে দেখানো লিঙ্কে ক্লিক করে কেউ সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন দেখলে তবেই রোজগার হবে ইউটিউব থেকে।
YouTube Partner Program: তবে শুধুমাত্র ইউটিউবে দেখানো বিজ্ঞাপন থেকে রোজগার করে জীবন চালানো প্রথমে কঠিন হতে পারে। এই কারণে সঙ্গে অন্য কাজ রাখা প্রয়োজন। নিজের চ্যানেলের ভিডিওতে বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য YouTube Partner Program এ যোগ দিতে পারেন। প্রত্যেক ভিডিও থেকে রোজগারে একটি অংশ কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সঙ্গে ভাগ করে নেয় এই ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম।
মাসে কত রোজগার: YouTube Studio থেকে Monitization বিভাগে গিয়ে চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেখানো সিলেক্ট করতে পারবেন। এখানেই ড্যাশবোর্ডে মাসে কত রোজগার হয়েছে দেখে নিতে পারবেন।
YouTube Premium: একবার প্ল্যাটফর্ম থেকে রোজগার শুরু করলে আপনি YouTube Premium -এ সাইন আপ করতে পারবেন। এই ফিচারে আপনার সাবস্ক্রাইবাররা চাইলে অতিরিক্ত খরচ করে বিজ্ঞাপন ছাড়াই আপনার চ্যানেলের ভিডিও দেখতে পাবে। সাবস্ক্রাইবারদের থেকে রোজগারের দ্বিতীয় পথ হিসাবে কাজ করবেএই YouTube Premium।
মার্চেনডাইস সেলফ: বিজ্ঞাপন ছাড়াও আয়ের আরও কিছু উপায় রয়েছে। যেমন ধরুন- মার্চেনইডাইস।টি-শার্ট, কফি মগ, ব্যাগ সহ নিজস্ব মার্চেনডাইস বিক্রি করে ইউটিউব থেকে রোজগার করতে পারবেন। প্রত্যেক ভিডিওর নিচে রাখতে পারবেন মার্চেনডাইস সেলফ।
ফ্যান ফান্ডিং: ফ্যান ফান্ডিংকরতে পারেন। একবার আপনার চ্যানেলে কিছু দর্শক এসে গেলে Patreon, Tipee অথবা Buy Me A Coffee এর মতো ওয়েবসাইট থেকে দর্শকদের কাছ থেকে রোজগার করতে পারবেন।
অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং: অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে আপনার রোজগার আরও বাড়তে পারে। তবে আপনার সঙ্গে কোন ব্র্যান্ডের গাঁটছড়া থাকলে তা ভিডিওতে জানিয়ে দিন।
ভিডিও লাইসেন্সিং: ভিডিও লাইসেন্সিং করতে পারেন। মনে করুন আপনার কোনো ভিডিয়ো ভাইরাল হয়ে গেলে বিভিন্ন মিডিয়া সেই ভিডিও স্ট্রিম করার জন্য আপনাকে অতিরিক্ত টাকা দেবে। এটাই হচ্ছে ভিডিও লাইসেন্সিং।
চ্যানেল মেম্বারশিপ: চ্যানেল মেম্বারশিপ করতে পারেন। চ্যানেলের মেম্বার হলে দর্শকরা অতিরিক্ত কনটেন্ট পেয়ে যাবেন। এইভাবে বাড়বে আপনার রোজগার। এ ছাড়াও চ্যাট পেমেন্টের মাধ্যমেও ইউটিউব থেকে ভালো আয় করা যায়। যেমন- লাইভ স্ট্রিম। এর সুপার চ্যাটের মাধ্যমে দর্শকদের কাছ থেকে রোজগার করতে পারবেন।
যা করতে হবে: চ্যানেলে অবশ্যই নিজের তৈরি ভিডিও দিতে হবে। পাশাপাশি ভিডিওতে ব্যবহার করা শব্দ বা গানও হতে হবে মেধাস্বত্বহীন। অন্যের ভিডিও বা অডিও ব্যবহার করলে আপনার ভিডিওকে পুনরায় ব্যবহার করা কনটেন্ট হিসেবে বিবেচনা করবে ইউটিউব। শুধু তা-ই নয়, ভিডিওগুলোর নির্মাতারাও আপনার চ্যানেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারেন। এ দুটি কাজ করলে চ্যানেলে মনিটাইজেশন সুবিধা চালু করে না ইউটিউব।
ইউটিউবের কমিউনিটি নীতিমালা: ইউটিউবের কমিউনিটি নীতিমালা মেনে ভিডিও প্রকাশ করতে হবে। অন্যথায় ভিডিওতে কমিউনিটি স্ট্রাইক পড়তে পারে। স্প্যাম কিংবা প্রতারণামূলক তথ্য, স্পর্শকাতর বিষয়, ধ্বংসাত্মক ও ভয়ংকর বিষয়, ভুল তথ্যসংবলিত কনটেন্ট ইউটিউবে দেওয়া যাবে না।
প্রফেশনাল কোর্স: শুধু কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করতে আজকাল অনেকেই প্রফেশনাল কোর্স করে বিষয়টিকে নিজের প্যাশন ও প্রফেশন হিসেবে গ্রহন করছেন।
ইউটিউব এমন একটি প্লাটফর্ম যেখানে আপনার কন্টেন্ট যদি ভালো হয়, সফলতা আসবেই। ওই চ্যানেল থেকে ইনকাম আসবেই একদিন না একদিন। তবে তার জন্য মূল কয়েকটি বিষয় আপনাকে জানতে হবে।
উপসংহার: ছিল মূলত ইউটিউব থেকে আয় করার সেরা ৫টি উপায়। দেশ বিদেশের বড় বড় ইউটিউবাররা এই মাধ্যমগুলো থেকেই প্রতিমাসে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ইনকাম করছেন। একবার যদি ইউটিউবে আপনি ভালো করতে শুরু করেন, তাহলে সরকারি বেসরকারি অনেক চাকরিজীবীদের থেকে অনেকাংশে আপনি বেশি ইনকাম করবেন। আপনার লাইফস্টাইলে আমূল পরিবর্তন আসবে। এসব দিক বিবেচনা করলে যাদের মনে হয় এই সেক্টরে ভালো করতে পারবেন, তাদের অবশ্যই চেষ্টা করা উচিত এখানে কিছু করার।
লেখক- শিক্ষক, প্রাবন্ধিক




