বিজয় কর রতন মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: হাওরে বোরো ধান কাটা শেষ।এখন শুধু ধান গোলায় তোলা ও গো খাদ্যের জন্য খেড় সংগ্রহের পালা।বিপত্তি বজ্রপাত।আকাশে কালো মেঘ দেখলেই হাওর থেকে কৃষকরা বাড়ির দিকে দৌড় দেয়।মাঠে শুকনো ধান আর শুনকো খেড় ফেলে অধিকাংশ কৃষক হাওরের খোলা মাঠে অথবা বড় সড়কে ধান শুকিয়ে বস্তায় পুড়ে রেখেছে। কিন্তু আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেই কৃষকরা হাওরে যেতে সাহস পায়না।শুধু মাএ বজ্রপাএের ভয়ে।
রাতের বেলা সোনালী ফসল পাহাড়ার সাহস পাচ্ছে না বলে হাওরের এমন অনেক কৃষক জানান,মাঝে মধ্যে ধান চুরি হয়ে যাওয়া ঘটনা ঘটেছে।কোনো যানবাহনের চালকরা বজ্রপাতের ভয়ে হাওরে ধান আনতে সাহস পায় না।মিঠামইনের বড় হাওরে এমন কোনো ছাউনি নেই যে কৃষকরা বজ্রপাতের সময় বা আকাশে কালো মেঘ দেখলে আশ্রয় নেবে।
সরজমিনে বৃহস্পতিবার সকালে বড় হাওরের ও অলওয়েদার সড়ক গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়। শত শত মণ ধানের বস্তুা।ফেলে রেখেছে। কিন্তু বৃষ্টি আর বজ্রপাতের ভয়ে বাড়ি আনতে সাহস পাচ্ছে না।অনেক কৃষক জানান,জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাতের বেলা খেড়ের পাড়ার নিচে রাস্তার পাশে ঘুমিয়ে ধান পাহাড়া দিতে হয়।কখন বৃষ্টি সহ বজ্রপাত হয়ে যায় তার কোনো সীমানা নেই।গত এক মাসে কিশোরগঞ্জের হাওরে বোরো ধান কাটা শুরু থেকে স্কুল ছাএী সহ ১০ জন কৃষকের প্রাণ গেছে বজ্রপাতে।
এদের মধ্যে মিঠামইন ও অষ্টগ্রামে গত ১ সপ্তাহে ৪ জন কৃষক বজ্রপাতে মারা যায়।এদের মধ্যে অষ্টগ্রাম উপজেলার কলমা ইউনিয়নের ইন্দ্রজিত (৩৫),একই উপজেলার কয়েরপুর গ্রামের স্বাধীন মিয় (১৫) বজ্রপাতে মারা যায়। এছাড়াও একই দিন মিঠামইন উপজেলার রানীগঞ্জের ফুলেছা বেগম (৬৫) স্বামী আশ্রব আলী। গত বুধবার মিঠামইনের ঘাগড়া ইউনিয়নের চমকপুর গ্রামের ফডু মিয়া (৩৫) পিতা আবদুল মোতালেব সে বাড়ির পাশে ধানের খলায় খেড় নাড়তে গিয়ে বজ্রেপাতে মারা যায়। শুধু ধান নয়,হাওরের জেলেরাও মাছ ধরতে সাহস পাচ্ছে না বজ্রপাতের জন্য। কৃষকরা বলেন,বড় হাওরের রমিজ মিয়া নামক একজন কৃষক বলেন তিনি ১০ একর জমি করছেন। কিন্তু জমির ধান কাটা শেষ হলেও বজ্রপাত ও বৃষ্টির কারণে ধান শোকাতে পারছে না।পাঁকা ধান রাস্তার উপরে বস্তায় পুড়ে রাখছেন।ধান শোকানোর পর ট্রলি বা ট্রাকট্টর দিয়ে নিজ বাড়ি কিশোরগঞ্জের কালিয়া কান্দা নিয়ে যাবে।
অপর কৃষক ইয়াহিয়া হাতিম বলেন,তিনি বড় দিঘার হাওরে ৫ একর জমি করছেন, ধান হয়েছে ৪৫০ মণ কিন্তু হাওর থেকে বজ্রপাত ও বৃষ্টিট কারণে বাড়িতে ধান আনতে সাহস পাচ্ছে না।তিনি বলেন,বজ্রপাতের কারণে ট্রলি চালকরাও হাওরে যেতে ভয় পাচ্ছে। অপর কৃষক ঘাগড়া ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো:আইয়ুব মিয়া জানান, তারও খাজা গৌরিয়া হাওরে ৫ একর জমি করছেন। ধান হয়েছে ৪ শত মণ ধান পেয়েছেন।কিন্তু অর্ধেক ধান বাড়িতে আনলেও বাকি অর্ধেক ধান বস্তায় পুড়ে সড়কে রেখে দিয়েছেন। বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে কোনো যানবাহন ট্রলি বা মহিষের গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্য দিকে ট্রলি চালকদের সাথে কথা বললে ট্রলি চালক হামিদ মিয়া জানান,তার বাড়ি ঘাগড়া গ্রামে বৈশাখের শুরু থেকে হাওর থেকে ধান টানছি কিন্তু বৃষ্টি বজ্রপাত হয়নি।গত ১ সপ্তাহ যাবৎ বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে হাওরে যেতে সাহস পাচ্ছি না।টাকা কামানোর চেয়ে জীবনের দাম অনেক বেশি অপর ট্রলি চালক সৈয়দ মিয়া তার গ্রাম একই স্থানে সে বলেন,যা কামানির সারা বৈশাখ মাসে কামাইছও অহন বৃষ্টি আর ঠাডার লাগি গাড়ি লইয়া বাহির হইতাম না। ১০ মণ ধান আনতে গিয়া ঠাডা পুইড়া মুইরা গেলে বউ বাচ্চা দেখবো কেডা। এখানে তারা প্রতি বছর অস্থায়ী কৃষক হিসাবে জমি করতে আসেন।তিনি আরও বলেন, ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু কৃষকরা গোলায় ধান তোলা নিয়ে শংকা প্রকাশ করছেন। একবার ধান শুকিয়ে বস্তায় পুড়ে রেখে আসলে আবার বৃষ্টি হলে বস্তার ধান ভিজে যায়। অনেক কৃষক অতিষ্ঠ হয়ে হাওরের ধান কম মূল্যে ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করছে।অন্য দিকে সুনামগঞ্জের বাঁধ ভেঙ্গে হাওরে পানি ডুকছে এসকল পানি উজান থেকে ভাটিতে আসা শুরু করছে।হাওরের কাটা ধান নিয়ে শংকায় রয়েছে কৃষকরা।কৃষকদের দাবি জরুরি ভিওিতে তিনটি উপজেলার হাওরে বড় বড় ছাউনি করে দেওয়ার দাবি জানান।তা নাহলে মৃত্যুর তালিকা আরও বাড়বে।
সম্প্রতি মিঠামইনে হাওরে ধান সংগ্রহ অভিযান ও ফসল কর্তন অনুষ্ঠানে মাননীয় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাসুদুল হাসান এসে ছিলেন।এসময় এক মত বিনিময় সভায় মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাঁন মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন হাওরে বজ্রপাত নিরোধক ছাউনি নির্মাণের বিষয়টি উওাপন করেন।এসময় উপস্থিত সকল কর্মকর্তাগণ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিষয়টি সমর্থন করেন।সচিব মহোদয় ব্যবস্হা করবেন বলে আশ্বাস দেন।
এ ব্যাপারে মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাঁন মোঃ আব্দুল্লা আল মামুন এর সাথে কথা বললে তিনি কিছু পরামর্শ দেন হাওর বাসীর জন্য।
(১) প্রাথমিক ভাবে বজ্রপাতের সময় সর্তক থাকতে হবে।
(২) বিদ্যুৎ এর খুঁটি ও লাইন উঁচু জায়গা থেকে দূরে রাখুন।
(৩) পানি থেকে সরে আসুন,নৌকায় থাকলে ছাউনির নিচে প্রবেশ করুন।
(৪)আপনার ভবনে যদি বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্হা না থাকে তবে আলাদা আলাদা কক্ষে অবস্থান করবেন।
(৫) ধান ক্ষেত বা খোলা মাঠে থাকলে তাড়াতাড়ি আঙুল কানে দিয়ে পায়ের আঙ্গুলের উপর ভর দিয়ে নিচে বসুন।
(৬) বজ্রপাতে আহত ব্যাক্তিকে বৈদ্যুতিক শকের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিন ও প্রয়োজনে হাসপাতলে প্রেরণ করুন।
(৭)গাছের নিচে, টেলিফোন বা কোনো ধরনের সংযোগের পাশে দাড়াবেন না।
(৮)মুঠোফোন কম্পিউটার, টিভি, ফ্রিজ সহ বিদ্যুৎ এর সুইচ বন্ধ রাখবেন।
(৯)বাড়ির নিরাপদ রাখতে আর্থিং সংযুক্ত বড় রড মাটিতে স্হাপন করতে হবে। বৃষ্টি বা মেঘের গর্জন না থামা পর্যন্ত নিরাপদে থাকা উচিৎ।জরুরী প্রয়োজনে রাবারের জুতা পড়বেন বজ্রপাতের সময়। এছাড়াও তিনি উপজেলা প্রশাসন থেকে সতর্কী করণ লিফলেট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করছেন বজ্রপাতের বিষয়ে।



