ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeআন্তর্জাতিকযুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর এল-সায়েদ

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর এল-সায়েদ

নিউজ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের মার্কিন সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। এ জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত হওয়ার নজির গড়েছেন ৪২ বছর বয়সী এই রাজনীতিক।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফল বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল-সায়েদের জয় নিশ্চিত হয়েছে।

নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর দেওয়া ভাষণে আবদুল এল-সায়েদ বলেন, ‘এতক্ষণ পর্যন্ত আপনারা হয়তো লক্ষ করেছেন, এই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে যখনই কথা বলেছি, সব সময় বলেছি ইনশাআল্লাহ বা আল্লাহ চাইলে। কিন্তু আজ, আজ রাতে আমরা সেই ইনশাআল্লাহকে আলহামদুলিল্লাহতে পরিণত করতে পারি।’
এরপর ডানপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের উদ্দেশে রসিকতা করে তিনি বলেন, ‘এর অর্থ হলো আল্লাহর প্রশংসা।’ তাঁর এই বক্তব্য নির্বাচনী বিজয়ের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।
গুরুত্বপূর্ণ আসনে ডেমোক্র্যাটদের জয়
মিশিগানের এই সিনেট আসনটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দীর্ঘদিনের ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্স পুনর্নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। সেই আসনে রিপাবলিকান প্রার্থী সাবেক কংগ্রেস সদস্য ও এফবিআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা মাইক রজার্সের মুখোমুখি হন এল-সায়েদ।
৬৩ বছর বয়সী রজার্সের পক্ষে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রিপাবলিকান পার্টির জাতীয় পর্যায়ের নেতারা। অন্যদিকে এল-সায়েদের বিজয়ে ডেমোক্র্যাটরা গুরুত্বপূর্ণ আসনটি নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
নির্বাচনের আগে মার্কিন সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ডেমোক্র্যাটদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জয় প্রয়োজন ছিল। মিশিগানে এল-সায়েদের বিজয় দলটির প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার জন্যও বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইসরায়েল ইস্যুতে বিতর্কিত অবস্থান
নির্বাচনী প্রচারণার পুরো সময়জুড়েই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে এল-সায়েদের অবস্থান ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করে তিনি ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন।
তাঁর বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান জানালেও অন্যদিকে সামরিক সহায়তার মাধ্যমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
ইসরায়েল অবশ্য গাজায় গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সও এল-সায়েদের এই অবস্থানের বিরোধিতা করেন। ফলে নির্বাচনে ইসরায়েলবিষয়ক নীতি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে।
এল-সায়েদ নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং রাজনীতিতে করপোরেট প্রভাব সীমিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন। তাঁর নির্বাচনী কর্মসূচিতে সবার জন্য সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যসেবা বা ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ নীতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
২৫০ রাব্বির আপত্তি, ইহুদি ভোট নিয়ে বিতর্ক
ইসরায়েলবিষয়ক অবস্থানের কারণে নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এল-সায়েদকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ২৫০ জন রাব্বির সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। জেরুজালেম পোস্টের ২ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নননেগোশিয়েবল মিশিগান’ নামের একটি উদ্যোগের মাধ্যমে ওই রাব্বিরা এল-সায়েদ ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছে ইসরায়েল বিষয়ে তাঁদের উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান।
তাঁরা ইসরায়েলে ইহুদি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রতি সমর্থন এবং জায়নবাদী ইহুদিদের নিরাপত্তার বিষয়ে এল-সায়েদের কাছ থেকে স্পষ্ট অঙ্গীকার চেয়েছিলেন। তবে ডেট্রয়েটে ২৪ অক্টোবরের এক নির্বাচনী সমাবেশে এল-সায়েদ ও ওবামা তাঁদের দাবিগুলো নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেননি।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, মিশিগানের বাইরে থেকেও এই উদ্যোগে সমর্থন আসে। সংগঠনটির দাবি অনুযায়ী, মিশিগানে প্রায় ১ হাজার ৯০০ জন এবং দেশজুড়ে ৪ হাজার ৫৬০ জন তাদের আবেদনে স্বাক্ষর করেছিলেন।
এদিকে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সংগঠক জ্যাকব রাইখ জিউইশ টেলিগ্রাফিক এজেন্সিকে (জেটিএ) বলেন, একজন ইহুদি এবং ডেমোক্র্যাট হিসেবে নিজের পরিচয়ের মধ্যে তিনি দ্বিধাবিভক্ত বোধ করছিলেন। তাঁর বক্তব্য, ইসরায়েল বিষয়ে এল-সায়েদের অবস্থান এবং অতীতের কিছু মন্তব্য নিয়ে ইহুদি সম্প্রদায়ের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
তবে এল-সায়েদের প্রতি সহানুভূতিশীল কিছু ইহুদি ধর্মীয় নেতা ওই রাব্বিদের উদ্যোগের সমালোচনাও করেছেন। তাঁদের মতে, এ ধরনের চাপ প্রয়োগের কৌশল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিভাজন বাড়াতে পারে এবং ইহুদি সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক স্বার্থের জন্যও নেতিবাচক হতে পারে।
বিজয়ী এল-সায়েদ, নতুন রাজনৈতিক বার্তা
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণায় মাইক রজার্স এল-সায়েদকে উগ্রপন্থার প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন। তবে এল-সায়েদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। রয়টার্স জানিয়েছে, অভিযোগগুলোর পক্ষে কোনো সমর্থিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ডেমোক্র্যাটরা এসব প্রচারণাকে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যের অংশ হিসেবে সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে রজার্স ইসরায়েলপন্থী ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু অর্থনীতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার বিষয়টি তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় চাপ সৃষ্টি করে।
এল-সায়েদের এই বিজয় শুধু মিশিগানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসনের ফল নয়; যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব এবং প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানের ক্ষেত্রেও এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। তাঁর নির্বাচনী সাফল্য দেখিয়েছে, মুসলিম পরিচয়, ফিলিস্তিন ইস্যুতে অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া সম্ভব।-
এখন সিনেটে তাঁর ভূমিকা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ এবং মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে অবস্থান কতটা প্রভাব ফেলে, সেদিকেই নজর থাকবে মার্কিন রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের। সূত্র: রয়টার্স
আরো খবর
Continue to the category
- Advertisment -spot_img

Most Popular