নিউজ ডেস্ক : নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া স্মরণে ‘২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানে নারী ও নারীমুক্তি প্রসঙ্গ’ শীর্ষক সেমিনার আয়োজন করে বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র। ১০ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরসি মজুমদার হলে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারের শুরুতে বেগম রোকেয়ার প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান নারীমুক্তি কেন্দ্রের নেতৃবৃন্দ।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্তের সভাপতিত্বে, সাধারণ সম্পাদক নীলুফার ইয়াসমিন শিল্পীর পরিচালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সুস্মিতা রায়। সেমিনারে আলোচনা করেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সুপ্রিম কোর্টের জেষ্ঠ্য আইনজীবী সারা হোসেন, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক স্নিগ্ধা রেজওয়ানা, জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য ডা. তাজনুভা জাবীন, স্থপতি ফারহানা শারমীন ইমু, নাট্যকর্মী ও শিক্ষক মহসিনা আক্তার, মিরণজল্লা হরিজন ভুমি রক্ষা আন্দোলনের সংগঠক দীপিকা রানী, সংগীত শিল্পী বীথি ঘোষ, বাসদ (মার্কসবাদী)-র কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সদস্য জয়দীপ ভট্টাচার্য।
আলোচকরা বলেন- উনবিংশ শতকের প্রায় মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষে নারীরা বিশেষত মুসলিম নারীরা নানা সামাজিক, ধর্মীয় বিধিনিষেধের বেড়াজালে বন্দী ছিল। নারীদের সেই অবস্থা মুক্ত করতে লড়াই শুরু করেছিলেন বেগম রোকেয়া। তিনি অনুভব করেছিলেন একমাত্র শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে নারীদের মুক্তি সম্ভব। তাই সারাজীবন সমাজের সকল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নারীশিক্ষা প্রসারকে তাঁর জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি যে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন তা আজও চলমান। নারীর সামগ্রিক মুক্তি এখনও অর্জিত হয় নি। দেশকে গড়ে তোলার দায়িত্ব ও কর্তব্য নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের। কিন্তু রাষ্ট্র নারীকে কোন দৃষ্টিতে দেখছে তা-ই নির্ধারণ করে তাদের অবদানের স্বীকৃতি পাওয়া না পাওয়ার বিষয়টি। রোকেয়ার সময় থেকে আজকের সময় অনেক এগিয়েছে। কিন্তু নারী সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। বাল্যবিবাহ, শিক্ষার সুযোগ না থাকা, রাস্তা-ঘাট-পরিবহন-অফিস- আদালতে নিরাপত্তাহীনতা, বিচারহীনতা, ধর্ম বর্ণের বৈষম্য, নারীকে হেয় করে দেখা, ঘর-সংসার-সন্তান দেখাশোনার মূল দায়িত্বে নারী নির্ভরতা, নারীর স্বাস্থ্য-প্রজনন স্বাস্থ্যের অভাব, কর্মসংস্থান না থাকা, সম্পত্তি-উত্তরাধিকার-অভিভাবকত্ব প্রশ্নে নারী পুরুষের বৈষম্য, মজুরি বৈষম্য, কর্মক্ষেত্রে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র না থাকা, নারী নির্যাতন-ধর্ষণ-গণধর্ষণ-সহিংসতায় ন্যায়বিচার না পাওয়া, নারী-শিশু পাচার, প্রবাসে অনিরাপদ কর্মসংস্থান, পশ্চাৎপদ সামাজিক প্রথা, সিডও সনদে পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি, ইউনিফর্ম সিভিল কোড চালু, ধর্মীয় কুসংস্কার দূর না হলে রাষ্ট্রে নারীর অবস্থান কখনই সম্মানজনক হবে না।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের আমরা পেয়েছি ভীষণ সাহসী হিসাবে। এই আন্দোলনে তাদের বিরাট অবদান রয়েছে। এই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন শিক্ষার্থী, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শ্রমজীবী নারী, চিকিৎসক, আইনজীবী, অভিভাবক, গৃহিণীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার নারীরা। তারা গভীর রাতে হলের গেট ভেঙ্গে মিছিল নিয়ে বের হয়েছেন, ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সামনে নিরস্ত্র অবস্থায় দাঁড়িয়েছেন, ছাত্রদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়েছেন, পুলিশের কাছ থেকে টেনে ছাড়িয়ে এনেছেন গ্রেফতার করা ছাত্রকে, আন্দোলন সংগঠিত করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, পুলিশের গুলির সামনে শ্লোগান দিয়েছেন। হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা ও পরিচর্যা করেছেন শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। সন্তানদের মৃত্যু দেখে মায়েরা যখন রাস্তায় নেমে আসেন, ছাত্র আন্দোলন তখন গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। নারীদের এই সন্তান হারানোর ব্যথা, ক্ষোভ পূনর্জন্ম দিয়েছে দেশকে। ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশ ছেড়ে পালালে দেশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু অত্যন্ত বেদনার বিষয়, অভ্যুত্থান পরবর্তীকালে আন্দোলনের সাথে যুক্ত প্রথম সারির নারী নেতৃত্বদের আমরা রাষ্ট্র গঠনের কাজে যুক্ত করার তেমন উদ্যোগ দেখতে পাইনি।
বিদ্যমান মালিকী ব্যবস্থায় নারী একদিকে অর্থনৈতিক শোষণ, অন্যদিকে পুরুষতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা- এই দুই ধরণের শোষণের শিকার। যে ঐতিহাসিক সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অর্থাৎ যে ব্যক্তিসম্পত্তির মালিকানার প্রশ্নে নারী শোষণ-বৈষম্যের শিকার হয়েছিল সেই সম্পত্তির সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ একইসাথে একটা উর্বর ও কঠিন সময় পার করছে। নারীরা শিক্ষালাভ করতে পারে, কিন্তু রোকেয়া যে মর্যাদার কথা বলেছিলেন, সেটা আজও অর্জিত হয়নি। তাই রোকেয়া আমাদের কাছে আজও খুবই প্রাসঙ্গিক। তাঁকে চর্চা করা, তাঁকে বোঝা আজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’



