নাজমুল আহসান
সংস্কারের সমাজতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব ও শাসন বস্থা; এই তিনের মধ্যে যোগসূত্র কোথায়? এদের একটি অপরটিকে কীভাবে প্রভাবিত করে? রাষ্ট্র পরিচালনায় এ বিষয়গুলো যখন সমন্বিতভাবে ভূমিকা পালন করে, তখন রাষ্ট্রের চেহারা কেমন দাড়ায়? রাষ্ট্র তখন কতটুকু মানবিক হয়? রাষ্ট্র বিনির্মাণে এসব বিষয় বারবার আলোচনার দাবি রাখে।
সংস্কার শব্দটি আমাদের দেশে নানাভাবে ব্যবহৃত হয়। সংস্কারের বিপরীত শব্দ কী? ‘কুসংস্কার’ নামে বাংলা ভাষায় যে শব্দটি আছে তার দ্বারা অনেক সময় অন্ধবিশ্বাস বা প্রচলিত রীতিনীতিকে বোঝানো হয়, যা একটি সময়ের মানদণ্ডে ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত। সাধারণভাবে সংস্কার শব্দের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তনকেই বোঝানো হয় এবং তা সাধারণ বৈশ্বিক মানদণ্ডকে বিবেচনায় নিয়েই।
প্রশ্ন থাকতে পারে, সংস্কার নিয়ে কেন বারবার কথা বলতে হয়? প্রথম যুক্তিটি হচ্ছে, সংস্কার কোনো স্থির বিষয় নয়। এর মধ্যেই নিহিত গতিশীলতার প্রাণচাঞ্চল্য। তাই আজকের সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে যেটাকে আমরা সংস্কার বলছি, অনাগত ভবিষ্যতের কোনো একসময় সেটাই কুসংস্কার হিসেবে বিবেচনা করার দাবি উঠতে পারে। যে কারণে সংস্কারের চাহিদা ধারাবাহিক। তবে আমাদের দেশের বাস্তবতায় সংস্কার বারবার আলোচনায় আসার মূল কারণ, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি আসে বারবার, কিন্তু এর বাস্তবায়ন নেই।
এ জন্য সংস্কারের পেছনে সামাজিক চুক্তি তৈরি না করা বা সামাজিক চুক্তিতে গুরুত্ব না দেওয়াকে দায়ী করা যায়, যে চুক্তির মাধ্যমে সংস্কার প্রশ্নে জনগণের মধ্যে এক ধরনের নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। এ সামাজিক চুক্তি ছাড়া সংস্কার পোশাকি, লোক দেখানো ও ক্ষণস্থায়ী। লোক দেখানো সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ও সংস্কার নিয়ে চালাচালি যতটা সহজ, তার চেয়ে বেশ কঠিন এ সম্পর্কিত সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছা। এই সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছানোই সামাজিক সংস্কারের অংশ। তবে সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছাতে যে ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার তা দৃশ্যমান নয়। যেমনটা অবহেলিত থাকে সামাজিক সংস্কারের বয়ান তৈরি ও সম্মতি উৎপাদন করা, যা মানুষের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করে টেকসই সংস্কারের পথ প্রসারিত করে।
আমাদের দেশে সংস্কার নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয় তখনই, যখন সংস্কারকে শুধু রাজনৈতিক দল ও সমাজের উপরতলার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। এক সময় সমাজ সংস্কারকে বেশ প্রয়োজনীয় মনে করা হতো। এই ভূখণ্ডে এ রকম কয়েক ডজন নাম স্মরণ করা যায়, যাদের পরিচয়ের ক্ষেত্রে সমাজ সংস্কারকের তকমাটা জুড়ে গেছে কালের পরিক্রমায়। তাদের মধ্যে আছেন রাজ রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বেগম রোকেয়া, নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরী, হাজী মুহম্মদ মুহসীন প্রমুখ। এ রকম আরও অনেকেই ছিলেন, যাদের নাম আমরা জানি না। তাদের মধ্যে অনেক বৈসাদৃশ্যের মধ্যেও একটা সাদৃশ্য ছিল– তারা সবাই প্রথা ভেঙেছেন, সেটা যে পর্যায়ের হোক।
এই মুহূর্তে আমাদের দেশের অনেক কিছুর মতো সংস্কার নিয়েও অস্পষ্টতা আছে, যেমনটা অস্পষ্টতা আছে সরকার ও রাষ্ট্র নিয়ে। বেশির ভাগ সময়ই আমরা রাষ্ট্র বলতে সরকার বুঝি; আর সরকার বলতে আমলাতন্ত্র এবং প্রায় ক্ষেত্রেই একটাকে অপরটার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোর চরিত্র আমাদের রাষ্ট্র এখনও ধারণ করতে পারেনি, এটা তার একটি লক্ষণ হতে পারে।
বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি তাতে এ সংস্কারের সামগ্রিকতা তো বটেই, এর উদ্দেশ্যের স্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কী সংস্থার করতে চাই? রাষ্ট্রের, সরকারের, আমলাতন্ত্রের, নাকি রাজনীতির? পাশাপাশি সংস্কারের মাধ্যমে কোন প্রথাটা ভাঙতে চাই? নতুন কোন চর্চাটা শুধু করতে চাই? সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা কোথায়? সমতা, ন্যায্যতা, সহিষ্ণুতা, বৈশ্বিক মানদণ্ডের গণতান্ত্রিকতার সঙ্গে এর যোগসূত্রতা কতটুকু? এ বিষয়গুলো আলোচিত ও সুনির্দিষ্ট হওয়া দরকার। এ মুহূর্তের প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন, সংস্কার কমিশনগুলো যে সুপারিশমালা তৈরি করেছিল তার অগ্রগতি কতটুকু। অনেকেই বলে, এর অনেকটাই হিমাগারে চলে গেছে। সমালোচকরা বলছেন, বৈষম্যবিরোধী চেতনাকে কর্মসূচিতে পরিণত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যার পরিপ্রেক্ষিতে গত এক বছরে বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের অনেকেই প্রতারিত বোধ করছেন।
সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়া কি সরকারের সক্ষমতার অভাব, নাকি আন্তরিকতার ঘাটতি? নাকি এটি সংস্কার প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন না হওয়ার সীমাবদ্ধতা? এ ব্যর্থতার কারণেই সংস্কারের আলোচনা অনেক সময় শুধু উপরি কাঠামো নিয়ে হয়ে থাকে। উপরি কাঠামো নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে। কিন্তু এর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী হবে– তা ধারণা করতে না পারা সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ। সংস্কার প্রক্রিয়া তখনই সার্থক হয় যখন সংস্কার প্রশ্নে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এজেন্ডাও গুরুত্ব পায়। তাদের মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিতকল্পে কোনো অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা হয়। নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা যে কোনো প্রচেষ্টা সংস্কারের ন্যূনতম মানদণ্ড যে স্পর্শ করতে পারে না– তার সাক্ষী ইতিহাস।
প্রশ্ন করা যায়, কোন সংস্কারটা আগে; সমাজের নাকি প্রতিষ্ঠানের? আমরা এমন একটা সময়ে বসবাস করছি, যেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানকে সমাজ পরিচালনার একমাত্র নিয়ামক ভাবছি। রাষ্ট্রও তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান। ইতিহাস বলে, প্রতিষ্ঠান হচ্ছে উপরি কাঠামো। এর ভিত মানুষ ও তার সংস্কৃতি– সেখানটায় সংস্কার না হলে পরিবর্তন টেকসই হয় না। সংস্কার তখনই ঠুনকো হয়ে ওঠে, যখন এখানে এক ধরনের বাহ্যিক ঐকমত্যের প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্যে আটকে ফেলা হয়। সংস্কার প্রক্রিয়া এ আনুষ্ঠানিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্যে হারিয়ে যায়। সেই বিবেচনায় এ সময়ের সংস্কার আলোচনার পরিণতি কী হতে যাচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কার কি আবারও কোনো নেতিবাচক শব্দ হতে যাচ্ছে? যেমনটা আমরা দেখছি এক-এগারো পরবর্তী সময়ে।
নাজমুল আহসান: উন্নয়নকর্মী, psmiraz@yahoo.com



