সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতায় নজরুল ইসলামের ❝মানুষ❞ এর প্রাসঙ্গিকতা।
২০২৪ সালের অভূতপূর্ব গণ অভূত্থানের পর বাংলাদেশের আপামর জনগণের মধ্যে একটি আকাঙ্খার বিপ্লব ঘটে। কিন্তু এই বিপ্লব বেহাত হতে বেশী সময় লাগেনি। যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ঘটে এই অভূত্থান সে বৈষম্য নিরসন দূরে থাকুক সমাজে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষে-মানুষে বিদ্বেষ, হানাহানি, পরমতঅসহিষ্ণুতা, ধর্মীয় উগ্রবাদের এক মহোৎসব চলছে সমাজে। মব নামক মাৎস্যন্যায়ে উদ্ধিগ্ন গোটা দেশ। এই অবস্থায় আমাদের কাছে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক কাজী নজরুল ইসলাম নামক একজন মানুষ এবং তাঁর রচিত কবিতা ❝মানুষ❞।
আজ থেকে শতবর্ষ পূর্বে লিখিত মানুষ কবিতাটিতে কাজী নজরুল ইসলাম যে সমাজ বাস্তবতার বর্ণনা করেছেন তা যেন আজকের বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি। কবিতাটির প্রথম স্তাবকের দিকে যদি আমরা তাকাই যেখানে কবি বলছেন –
❝গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।❞
এখানে কবি প্রথমেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষনা করেন এবং স্রষ্টার সাথে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির নিবিড় সম্পর্কের কথা প্রকাশ করেন। মানুষ কবিতায় কবি সাম্যবাদের দৃষ্টিতে পৃথিবীর সব মানুষ এক ও অভিন্ন জাতি এই সত্যটি তুলে ধরেছেন। কবি এখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র জাতি প্রভৃতির বাইরে মানুষের আসল পরিচয় সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। আর সেই পরিচয়টি হচ্ছে মানুষ সৃষ্টিকূলের সর্বশ্রেষ্ঠ।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে, বাংলাদেশে আমরা মানুষের মধ্যে এই বোধ দেখতে পাচ্ছি না। বরং এই মহান আদর্শের বিপরীতে আমরা এই সমাজকে পরিচালিত হতে দেখছি। আমরা এখন এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে মানুষকে বিচার করা হচ্ছে জাত,ধর্ম,শ্রেণী, বর্ণ,লিঙ্গ প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে।
মানুষ কেন আধুনিক জামানাতে এসেও এই মহান দর্শন ধারণ করতে পারছিনা? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজতে গিয়ে কবি এই কবিতায় একটি গল্পের প্রবর্তন করছেন। যেখানে তিনি গল্পের ছলে বলেছেন মানুষের মধ্যেই পরমাত্মার বিরাজ করেন। এবং মানুষের সেবার মাধ্যমেই ঈশ্বর লাভ করা সম্ভব।
নজরুল বলছেন – ❝‘পূজারী, দুয়ার খোল,
ক্ষুদার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হলো!❞
কিন্তু আমাদের তথাকথিত পুরোহিত সমাজের মধ্যে যে লোভ তা কবিতার পরের দুই চরণেই আমাদের সামনে প্রতিফলিত হয়। যেখানে পূজারী ঈশ্বর প্রাপ্তির আশায় নয় বরং ঈশ্বর থেকে বর প্রাপ্ত হয়ে রাজা হবার আশায় আকুল। কবির ভাষায়-
❝স্বপ্ন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়
দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হ’য়ে যাবে নিশ্চয়!❞
বর্তমান বাংলাদেশে যে ট্যাগিংয়ের একটা নোংরা খেলা চলছে বিশেষ করে ইসলামের নামে । তার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ মানুষ কবিতায় রয়েছে।
❝মসজিদে কাল শিরনী আছিল, অঢেল গোস্ত রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি!
এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে-আজারির চিন্
বলে ‘বাবা, আমি ভুকা ফাকা আছি আজ নিয়ে সাত দিন!
*******************************
ভুখারী কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল – তা’ হলে শালা
সোজা পথ দেখ!’ গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!❞
ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে একজন মানুষকে অচ্ছুত করার যে রাজনীতি এবং তাকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার যে প্রক্রিয়া তা কবিতাটির এ অংশে কবি যে সুন্দর ভাবে চিত্রিত করেছেন তা দেখে মনে হতেই পারে কবি যেন আজকের সমাজ বাস্তবতার উপর ভিত্তি করেই লিখেছেন লাইনগুলো।
এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের পথ কবি একই কবিতায় বর্ণনা করেছেন। ধর্মের প্রকৃত আদর্শ যে এই সমস্ত গোঁড়ামির উর্ধ্বে, প্রকৃত ধর্ম দিয়েই যে এই ধর্মান্ধতা মোকাবেলা করতে হবে, ধর্মের সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যে প্রকৃত যুদ্ধ করতে হবে ধর্ম ব্যবসায়ীদের সাথে,তার একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে কবিতাটির এ-ই অংশে। যেখানে কাজী নজরুল ইসলাম ধর্মীয় ইতিহাসের নায়কদের ধর্ম ব্যবসার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার আহ্বান জানাচ্ছেন ঠিক এই ভাবে –
❝তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী!
কোথা চেঙ্গিস্, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!
হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়! ❞
আজকের বাংলাদেশের দিকে আমরা যদি তাকাই, তবে আমরা দেখবো নানা ধরনের ধর্মীয় ফতুয়া বাজির এক জয়জয়কার। এমন সব বিধান -কানুন দেয়া হচ্ছে,যা কোনো ভাবেই বর্তমান অবস্থায় মেনে চলা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে যা মানবিকতার বিরুদ্ধাচরণ করছে। এক্ষেত্রে নানা ধর্ম গ্রন্থ থেকে রেফারেন্স টেনে বিষয়টাকে ঈমানের মূল বিষয় গুলোর সম পর্যায়ে নেয়া হয়। যা এক ধরনের জটিলতার সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে মানুষ কবিতার নির্দেশনা স্পষ্ট –
❝মানুষেরে ঘৃণা করি’
ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি’ মরি’
ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে,
পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।❞
এই চরণ গুলোর প্রাসঙ্গিকতা বর্তমান সমাজে অনস্বীকার্য। কেননা শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রে নয় রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রেও জনবিরোধী কোনো বিধান জনগনের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা কোনো অবস্থাতেও গ্রহণযোগ্য নয়।
আমরা আমাদের সমাজে পরমত ও পরধর্মের প্রতি একধরনের বিদ্বেষমূলক আচরণ লক্ষ্যকরি। নিজের ধর্মকে বড়করে দেখিয়ে অপরের ধর্মকে ছোট করে দেখানোর এ কদর্য প্রতিযোগিতায় আমরা লিপ্ত। প্রায়ই আমরা হিন্দু ধর্মের লোক দ্বারা ইসলামের নবীর অবমাননা,মুসলমান দ্বারা হিন্দু দেবী অবমাননার খবর পাই। যা ধর্মীয় দাঙ্গার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কিন্ত মানুষ কবিতায় নজরুল সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের এক অনন্য নজীর স্থাপন করছেন ঠিক এই ভাবে –
❝আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মাদ
কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,
আমাদেরি এঁরা পিতা-পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
তাঁদেরি রক্ত কম-বেশী ক’রে প্রতি ধমনীতে রাজে!
*****************************
হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা,
কে জানে কাহার অন- ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?❞
বর্তমান বাংলাদেশে যে চলমান মব কালচার, ঘৃনা উৎপাদনের সংস্কৃতি, ভিন্ন মতের জন্য মানুষকে কতল যোগ্য করে তোলা, যা মূলত বিগত ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যাবস্থার সময় থেকে শুরু হয়ে এখনো চলমান। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নাস্তিক,জামাত- বিএনপি,হেফাজত, শাতিম, শাহবাগী, বা হাল আমলের বাউল, দোসর প্রভৃতি ট্যাগ দিয়ে বিনা বিচারে মানুষের উপর হামলে পড়া (ক্ষেত্র বিশেষে হত্যা করা পর্যন্ত) । যা আসলে আমাদের সামগ্রিক অজ্ঞতাকেই প্রকাশ করে। আমাদের মানবিক মূল্যবোধের যে চরম অবক্ষয় ঘটেছে এই দিকেই ইঙ্গিত করে। মানুষ কবিতা বলছে –
❝কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
হয়ত উহারই বুকে ভগবান্ জাগিছেন দিবা-রাতি!
অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান্ উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ’ ভজনালয়
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!❞
কবি এখানে থেমে থাকেননি এগিয়েছেন আরও। বলেছেন, ওই ঘরে হয়তো জন্ম নেবে এমন কেউ, যার সমতুল্য কিছু দুনিয়া এর আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। শর্তসাপেক্ষ এই মানব মহিমা বাহ্যত পশ্চিমা উদারনীতিবাদেরই তুল্য। কিন্তু অন্তর্গত মেজাজে উল্টোটাই বেশি সত্য বলে প্রতীয়মান হয়। নজরুলের শর্ত এমন নয় যে ব্যক্তিকে সক্রিয় সাধনায় কোনো কিছু অর্জন করতে হবে; বরং ব্যক্তির স্বাভাবিক অস্তিত্বের মধ্যেই আছে ওই সম্ভাবনা, যা নিজেই শর্ত পূরণ করবে।
তিনি বলেছেন –
❝হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর-বাসে
জন্মিছে কেহ- জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে!
যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
আজিও বিশ্ব দেখনি,-হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে!❞
কবিতাটির শেষাংশে এসে কবি প্রচার করছেন মানবতাবাদের সেই অমর বাণী এবং একই সাথে তিনি হতাশ হচ্ছেন মানুষের লোভ ও অজ্ঞতার জন্য।তিনি দৃঢ় ভাবে বলছেন –
❝বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দু’চোখে স্বার্থ-ঠুলি,
নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হ’য়েছে কুলি। ❞
বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মানুষ কবিতাটি কতখানি প্রাসঙ্গিক তা এই এক চরণের মাধ্যমেই প্রতীয়মান হয়। আমাদেরকে অবশ্যই আজ এই অমানুষের সমাজকে সুন্দর সমৃদ্ধ সমাজে পরিণত করতে চাইলে বারবার ফিরে যেতে হবে নজরুল ইসলামের ❝মানুষ❞ এর কাছে।
লেখকঃ এইচ.এম ইয়াসিনুল আরাফাত



