ঢাকা  রবিবার, ২৭শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১০ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশসীমানা জটিলতায় অবহেলিত বয়ারচর

সীমানা জটিলতায় অবহেলিত বয়ারচর

শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবাহীন লক্ষাধিক মানুষ, দস্যুর দাপটে আতঙ্ক

নাজমুল হোসেন, বিশেষ সংবাদদাতা : মেঘনা নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা বয়ারচর। কাগজে-কলমে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার অংশ হলেও বাস্তবে এটি যেন প্রশাসনের ‘অচেনা ভূখণ্ড’। সীমানা নিয়ে নোয়াখালীর হাতিয়া ও রামগতির দীর্ঘদিনের বিরোধে আটকে আছে চরটির ভাগ্য। এর খেসারত দিচ্ছেন সেখানে বসবাসকারী লক্ষাধিক মানুষ—যারা এখনো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এই চরজুড়ে মানুষের বসতি থাকলেও নেই পর্যাপ্ত অবকাঠামো। একেকটি ওয়ার্ডে ১২ থেকে ১৫ হাজার মানুষের বসবাস, অথচ বেশির ভাগ ওয়ার্ডেই নেই কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিরক্ষর থেকে যাচ্ছে।

চরের বাসিন্দা আবদুল করিম (৪৫) বলেন, “আমার দুই ছেলে স্কুলে যায় না। এখানে কোনো স্কুলই নেই। নদী পাড়ি দিয়ে দূরে পাঠানো সম্ভব না।”

বয়ারচরে নেই কোনো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কোনো প্রসূতি মা বা গুরুতর রোগী অসুস্থ হলে ২০ কিলোমিটার নদীপথ ও কাঁচা সড়ক পাড়ি দিয়ে নিতে হয় রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেকের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।

স্থানীয় গৃহিণী রাশেদা বেগম বলেন, “ডেলিভারির সময় খুব কষ্ট হয়। অনেকেই মাঝপথেই মারা যায় বা জটিলতা বাড়ে।”

মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সুবিধা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে জরুরি যোগাযোগও কঠিন হয়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের সময় কোনো পূর্বাভাস বা সহায়তা সময়মতো পৌঁছায় না।

চরের বিভিন্ন স্থানে কাঁচা সড়ক থাকলেও সেগুলোর উন্নয়ন হয়নি। স্থানীয়রা বলছেন, সীমানা বিরোধের কারণে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই এগোয় না।

২০০৭ সালে দায়ের করা একটি মামলায় উচ্চ আদালত রামগতির পক্ষে রায় দিলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে বয়ারচর আজও অবহেলিত।

চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাওহীদুল ইসলাম সুমন বলেন, “বয়ারচরের সব বাসিন্দা রামগতির ভোটার। কিন্তু হাতিয়ার কিছু লোক এসে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, এতে সমস্যা আরও জটিল হচ্ছে।”

একাধিক দস্যুবাহিনীর দাপটে বয়ারচরের পরিস্থিতি দিন দিন অস্থির হয়ে উঠছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধ প্রায়ই ঘটছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এ অবস্থায় নিরাপত্তাজনিত কারণে দুটি পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিটন দেওয়ান বলেন, “দস্যুদের ব্যাপক উৎপাত রয়েছে। পুলিশের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়েছে। পাশাপাশি এলাকা নিয়ে দুই পক্ষের দাবি থাকায় জটিলতা রয়েছে।”

লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, “বিষয়টি নিয়ে হাতিয়ার সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

সীমানা বিরোধে আটকে থাকা বয়ারচর যেন রাষ্ট্রের সেবার বাইরে একটি দ্বীপ। উন্নয়ন ও নিরাপত্তার অভাবে সেখানে বেড়ে উঠছে একটি বঞ্চিত প্রজন্ম। দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এই জনপদের সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular