বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টিতে নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্ৰামের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে দুই দিনে ২ হাজার হেক্টর পাকা ধান তলিয়ে গেছে। চারদিকে কৃষকের আহাজারি।
রবিবার বিকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের হাওর ৩ উপজেলায় বৃষ্টি সহ বজ্রপাত হচ্ছে। পানি বাড়ার সাথে সাথে বজ্রপাতের ভয়ে পাকা ধান কাটতে নামতে পারছে না কৃষকরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত রবিবার থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর , আব্দুল্লাহপুর, আদমপুর, সহ অন্যদিকে মিঠামইন উপজেলার ঢাকির হাওর, ঘাগড়ার হাওর,বড় হাওর, মিঠামইনের হাওর, সহ ইটনার ডুইয়ার পাড় ও ধনপুরের উত্তর হাওরের প্রায় ২ হাজার হেক্টর পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর, আব্দুল্লাহপুর,হাওরে কৃষকরা পানির নিচে আধা পাকা ধান কাটছেন । নৌকা দিয়ে ধান কেটে তীরে শুকনো জায়গায় আনা হচ্ছে।কোন কোন জায়গায় শ্রমিকরা নয়নভাগায় ধান কাটছেন। অধিকাংশ জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। মাত্র ৪-৫ দিন পর এ সকল জমির ধান কেটে ঘরে তুলার কথা ছিল তা এখন পানির নিচে।
মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে খয়েরপুর হাওরে ১০ একর জমি আবাদ করে ছিলেন কৃষক মজনু মিয়া । কিন্তু শ্রম ও ঘামে ফলানো সেই ধান এবার তলিয়ে গেছে পানিতে। মজনু মিয়ার পরিবারে সারা বছরের খোড়াক, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা সহ হাটবাজার চলে জমির ধানের আয় থেকে কিন্তু একটি বছর কীভাবে চলবে, কোথা থেকে ঋনের টাকা শোধ করবেন এই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। বিকল্প আয়ের কোন সংস্থান নেই তার।
সোমবার বিকেলে তলিয়ে যাওয়া জমির ধান দেখে পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি কাঁদছিলেন । মজনু মিয়া বলেন, আমার সব শেষ পেপারে দিয়ে কি অইবো সরকার তো আমার টেহা দিতো না। আমার ধান গুলি পাইক্কা গিয়েছিল । আর দুই দিন পরে জমিডা কাটবার সিদ্ধান্ত নিছলাম, এর মধ্যে আল্লার গজব পড়ছে ।পরিবার নিয়া কেমনে চলমু। এই হাওরে এমন অনেক কৃষক রয়েছে তাদের ও একই অবস্থা। তারা বলেন, নদীতে পলি পড়ে নদী ভরাট হওয়ার কারণে এবং ফসল রক্ষা বাঁধের প্রকল্প সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।
প্রসাশন থেকে মাইকে ঘোষণা দেওয়ার পর আমরা জমি কাটার সিদ্ধান্ত নেই কিন্তু দুই দিনের মধ্যে সকল জমি তলিয়ে যাবে আমরা বুঝতে পারিনি। তলিয়ে যাওয়া ধান পচন শুরু হয়েছে। অষ্টগ্রামর বড় হাওরের কৃষক দানা মিয়া বলেন, পাহাড়ি ঢলের পানি নামলেই এই হাওরে পানি ঢুকে পড়ে। হবিগঞ্জ সিমান্তের খোয়াই নদীর ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতি বছরই অষ্টগ্রাম অংশে জলাবদ্ধতা তৈরি হয় । বড় হাওরের কৃষক নজরুল মিয়া জানান, তার ৯ একর জমির মধ্যে ৭ একর তলিয়ে গেছে। পানি যদি আরো বাড়তে থাকে তাহলে বাকী ২ একর ও তলিয়ে যাবে । জমির ধান পানি নিচে থাকায় গোড়ায় পচন ধরেছে । ইটনার বড় হাওরের কৃষক রমজান আলী বলেন,দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ৪ একর হাইব্রিড ধানের আবাদ করেছিলেন, কিন্তু ধান পাকা শুরুতেই পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন ঋন শোধ ও পেটের ভাত যোগানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
প্রবল বর্ষণে ধান তলিয়ে গেলেও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের নিকট এ সংক্রান্ত ক্ষতির সঠিক হিসাব নেই। তবে কৃষকদের দাবি আড়াই হাজার হেক্টর বুরো জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কিশোরগঞ্জের হাওরে ১লাখ ৪ হাজার পাঁচশত পঁয়ত্রিশ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। যা থেকে প্রায় ৭ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন চাল পাওয়া যাবে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সাদীকুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নদী পানি প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপনে আরো কয়েকদিন সময় লাগবে। তিনি জানান, পাকা ধান গাছ ৫-৬ পানির নিচে থাকলে ক্ষতির সংখ্যা বাড়বে,
তবে পানি নেমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ টা কমবে। তাই আশি শতাংশ পাকা ধান কেটে ফেলার নির্দেশ দেন তিনি কৃষকদের। তিনি আরো জানান,হাওরে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৪৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।




