নিউজ ডেস্ক: প্রায় সাত দশক পর ভারতের আসাম থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে আবারও আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন শুরু হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) আসামের ডিব্রুগড়ের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে ‘ডিএলবি পাতকাই’ নামের একটি বার্জ বাংলাদেশের ঢাকার পানগাঁও বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর উচ্চ আসাম থেকে কোনো বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে এটাই প্রথম আন্তর্জাতিক কার্গোযাত্রা।
ভারতের কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ চলাচল ও নৌপথবিষয়ক মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বগিবিল টার্মিনাল থেকে বার্জটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা উদ্বোধন করেন। ‘কুশল কুনওয়ার’ নামের একটি টাগবোট বার্জটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অনুষ্ঠানে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
চালানটিতে থাকা মিথানল উৎপাদন করেছে আসামের নামরূপে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেড (APCL)। এটি ভারতের ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-২ (NW-2) বা ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাবে। এরপর ইন্দো-বাংলাদেশ প্রটোকল রুট (IBPR) ব্যবহার করে চালানটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ঢাকার পানগাঁও বন্দরের দিকে যাবে। পুরো যাত্রাপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার।
ভারতের বন্দর মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ যাত্রাকে ব্রহ্মপুত্র নদকে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের সংযোগকারী বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করিডোর হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও মিথানল চালান পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। বগিবিল ও ধুবড়িতে সম্প্রতি কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন অবকাঠামো স্থাপনের ফলে এ আন্তর্জাতিক নৌপণ্য পরিবহন সম্ভব হয়েছে।
ডিব্রুগড়ের সঙ্গে নদীপথে বাণিজ্যের ইতিহাস অবশ্য আরও পুরোনো। ভারতের সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, উনিশ শতকে ডিব্রুগড় পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৮৫৬ সালের মধ্যে কলকাতা থেকে সরকারি স্টিমার ডিব্রুগড়ে পৌঁছাত। পরবর্তী সময়ে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে চা, কাঠ ও যাত্রী পরিবহন হতো। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী নদীপথের বাণিজ্যিক সংযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এরপর ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে ডিব্রুগড় এলাকায় নদীর তলদেশের পরিবর্তন ঘটে। ১৯৫৪ সালে ডিব্রুগড় ঘাট থেকে নিয়মিত পণ্য বুকিং বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর নৌঘাটটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দীর্ঘ সময়ের জন্য অঞ্চলটির ঐতিহাসিক নদীবাণিজ্য থেমে থাকে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত-বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে আবারও পণ্য ও যাত্রী চলাচল বাড়ছে। ১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশ নদীপথে বাণিজ্য ও ট্রানজিট বিষয়ে প্রটোকল স্বাক্ষর করে। ১৯৮৮ সালে সাদিয়া থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের প্রায় ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে ভারতের ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-২ ঘোষণা করা হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে এ নৌপথে নিয়মিত কার্গো পরিষেবা শুরু হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে টাটা স্টিলের বার্জ বাংলাদেশ হয়ে গুয়াহাটির পান্ডুতে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ নদী ক্রুজও বাংলাদেশ হয়ে বারাণসী থেকে ডিব্রুগড় পর্যন্ত যাত্রা করে। এদিকে বগিবিলের যাত্রী ও পণ্য টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে এবং টার্মিনালটি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চালু হয়।-
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নদীপথে পণ্য পরিবহন সড়কপথের তুলনায় জ্বালানি ব্যয় ও যানবাহনের চাপ কমাতে পারে। একই সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের উৎপাদন ও বাণিজ্যকে বাংলাদেশসহ আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও এ নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আসাম থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে মিথানলের এ চালান তাই দীর্ঘদিন পর একটি ঐতিহাসিক নৌবাণিজ্যিক সংযোগ পুনরুজ্জীবনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনাও সামনে এনেছে।




