ঢাকা  শনিবার, ১৮ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ৩রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅর্থনীতিবাংলাদেশকে বিনিয়োগের কেন্দ্র করতে চায় সরকার

বাংলাদেশকে বিনিয়োগের কেন্দ্র করতে চায় সরকার

নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশকে আরও আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলে উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্র বানাতে চায় সরকার। একই সঙ্গে নীতির ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষাকে আগামী পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সংলাপ প্ল্যাটফর্ম ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত সম্মেলনটি ৩ থেকে ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে শতাধিক দেশের প্রায় ২০০ বক্তা, ৩০০ প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যুক্ত হয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন নির্বাচিত সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতির ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া এবং অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে জোর

বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানি খাত সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা অপরিহার্য বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তরুণ জনগোষ্ঠীকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, ভাষাগত সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং নতুন উদ্যোগকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

সামাজিক সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগ

সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও কার্যকর করার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দিতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের প্রণোদনা ও কৃষিসেবার সঙ্গে যুক্ত করতে কৃষক কার্ড এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। পরবর্তী সময়ে ইউনিভার্সেল কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকদের সমন্বিত সরকারি সেবা দেওয়ার লক্ষ্যও তুলে ধরেন।

স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরামর্শ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগী পাঠানোর কাজে এসব কর্মী ভূমিকা রাখবেন।

শিক্ষা ও কৃষিতে পরিবর্তনের পরিকল্পনা

শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু সনদ অর্জনের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। আনন্দময় শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি।

প্রথম শ্রেণি থেকে বিনামূল্যে স্কুলের পোশাক, ব্যাগ, দুপুরের খাবার ও বৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা বলেন তিনি।

কৃষিকে অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, গ্রামীণ উদ্যোক্তা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি শিল্পের উন্নয়নের কথাও তুলে ধরেন।

পানি, পরিবেশ ও অবকাঠামো

আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও বলেন তিনি।

পরিবেশ সুরক্ষায় পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বঙ্গোপসাগর ঘিরে আঞ্চলিক সহযোগিতা

বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও গভীর করার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। জাহাজ চলাচল, মৎস্য, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন।

বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়লে নতুন বাজার তৈরি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি জানান।

এ ছাড়া মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথাও তিনি বলেন।

তিন দিনের আন্তর্জাতিক সংলাপ

‘Fragments, Frontiers and Futures: Navigating Power, Technology and Trust in a World Rewritten’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এবারের বিওবিসিতে ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও সংযোগ, জলবায়ু ও মানব নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও সুশাসনসহ সমসাময়িক নানা বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।

সম্মেলনে সাবেক সার্বিয়ান প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, সাবেক মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এবং সাবেক মালির প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।-

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সহযোগিতাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার একটি বিস্তৃত পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। সরকারের লক্ষ্য—নীতির স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশকে একটি প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ ও উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করা।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular