ফেনী প্রতিবেদক: উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে স্বৈরাচার ও গুপ্ত দল আবার এক হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে ফেনীর ফুলগাজী সরকারি পাইলট হাই স্কুল মাঠে তিন মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে দেশের ভাতা প্রধান অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। সমাজ কল্যাণ, কৃষি ও ধর্মমন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এসময় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় ভাতা প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখতে দেশে বিশৃঙ্খলা জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র সৃষ্টির পাঁয়তারায় জড়িতদের কঠোর জবাব দিতে জনগণের প্রতি আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল এক দফা, এক দফা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আসলে তারা কি চায় জনগণও স্পষ্ট নয়।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে একটি দল বেহেস্তের টিকিটও বিক্রি করেছিলো। অথচ বেহেশত ও দোজখের মালিক কেবলমাত্র এক আল্লাহ।
তিনি উপস্থিত জনতার কাছে জানতে চান, এসব যারা করেছে তার কি শিরক ও মুনাফেকি করেনি। বিগত ১৭ বছর বিএনপির কয়েক হাজার নেতাকর্মী মামলা-হামলা ও গুমের শিকার হয়েছে।
আর তারা তখন কোথায় ছিলো এ প্রশ্নও করেন সরকার প্রধান। তিনি বলেন, তারা ৭১ এর ভূমিকায় ফিরে গেছে, মনে রাখতে হবে মানুষ জীবন ও ইজ্জত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে। ১৭ বছর দেশে গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় উন্নয়নের চাকা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কর্মে পরিণত করতে চায় বিএনপি সরকার।
উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন চাইলে ষড়যন্ত্র নিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিএনপি যখনই রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে দেশ ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কাজ করেছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন সময় এগিয়ে যাওয়ার। সে জন্যে অনুকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতি জরুরি। কেউ যাতে অযথা পরিবেশ ঘোলাটে করতে না পারে এ নিয়েও জনগণকে সজাগ থাকতে হবে।
দেশ-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার নানামুখী কাজ করছে বলে জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিভিন্ন ভাতা চালু করায় দলমত ভুলে জনগণই উপকৃত হচ্ছে।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ফেনীতে এসে আমি উৎফুল্ল। নিজের বাড়ি মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার মা নেই, বাবাও নেই। ফেনী আমার মায়ের বাড়ি, মায়ের হিসেবে আমার নানার বাড়ি। মা যেহেতু মারা গেছেন, আপনারাই আমার আপনজন আপনরাই আমাকে দেখে রাখতে হবে। ফেনীবাসীই আমার অভিভাবক। তখন উপস্থিতি হাত উঁচু করে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানান।
বক্তব্যের আগে মঞ্চ থেকে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম ও পুরোহিতদের ভাতা প্রদান এবং ২৪৯ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার প্যানেল স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন করেন সরকার প্রধান।
কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় ফেনী জেলায় মোট ৫ হাজার ৬৪৩ জনকে কার্ড দেওয়ার জন্য নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ১ হাজার ১২ জন কৃষকের উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্য থেকে ১০ জন কৃষক প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সরাসরি কৃষক কার্ড গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে, জেলার বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত ও সেবায়েতদের সম্মানী ভাতা প্রদানের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় ফেনী জেলায় মোট ২৭৫ জনকে সম্মানীর জন্য মনোনীত করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মনোনীতদের মধ্য থেকে ৬ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম, ২ জন সেবায়েত এবং ২ জন পুরোহিত প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মানী গ্রহণ করেন।
এসময় অনলাইনে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সভামঞ্চ থেকে ভাতাভোগীরা নিজেদের মোবাইল ফোনে ভাতার অর্থপ্রাপ্তির খুদে বার্তা পান।
দিনব্যাপি সফরের শুরুতে দুপুর সোয়া ২টায় ফেনীর পরশুরাম পৌঁছেই মৌসুলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে বহু প্রতীক্ষার মহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (১ম পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দুপুর সোয়া ২টার দিকে সড়কপথে পরশুরাম উপজেলার ঘাটঘর এলাকায় পৌঁছেই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তিনি। এসময় জনগণও ভিজে উদ্বোধন উপভোগ করেন। এসময় নদীপাড়ে একটি গাছের চারা রোপণ করেন তিনি।
পরে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, একটি জনবহুল দেশে রাজনৈতিক দলের দুষ্ট লোকজন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটাচ্ছে আর সেটিকে পুঁজি করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। তিনি বলেন, এতে দেশের উন্নয়নের ব্যাহত হলে তার দায়বারও তাদের রিতে হবে। বিএনপি সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধ পরিকর।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডে শুধু দেশই নয়, বহি:বিশ্বেও বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অথচ তারা অন্যেদর নসিয়ত করে বেড়াচ্ছে। বিভ্রান্ত থেকে দেমকে বাঁচাতে হলে ১৯৭১ ও ৮৬ সালে কোটি রাজনৈতিক দলে ভূমিকা কি ছিলো তা আবারও জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।
অরাজকতা ও ষড়যন্ত্রকারীদের কঠৌর জবাব দিতে জনগণের প্রতি আহ্বানও জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, দল যার তার দেশটা সবার, গণতন্ত্র অব্যাহত রাখতে উন্নয়নের পাশাপাশি জনগণকে জনগনকে সজাগ থাকতে হবে।
সরকার প্রধান বলেন, একটি রাজনৈতিক দল ৭১ -এর রূপে আবারও ফিরে গেছে, মা-বোনদের ইজ্জত হরণ আর হত্যায় মেতে উঠেছে। বিএনপি নেতাকর্মী ও উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন এখন সময় এসেছে এদের মুখোশ উন্মোচনের।
নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী ওই রাজনৈতিক দলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দয়া করে আগে নিজের ঘর সামলান, পরে অন্যদের নসিয়ত করুন।
দেশে অনেক রাজনৈতিক দল থাকলেও একমাত্র বিএনপিি দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বরেন, বর্তমান সরকারের ৫ বছরের মেয়াদে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। একইসাথে এসব স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী বিএনপি সরকার গঠন করেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। এর ফলে সরকারের দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও দেশের ১৩ লাখ কৃষক উপকৃত হয়েছে।
পর্যায়ক্রমে দেশের সব বন্ধ মিল করকানা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, এসব কল কারখানা চালু হলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনীতির চাকাও সচল হবে।
১৭ বছর স্বৈরাচার সরকার জনগণের কণ্ঠরোধ করে অধিকার বঞ্চিত করেছিলো। ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণের রায়ে বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে সে অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে।
মহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন(১ম পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বৃহত্তর নোয়াকালীর মানুষ বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এর ফলে নতুন করে ৩৪ হাজার হেক্টর জমি আবাদের আওতায় আসবে। এক লক্ষ মেট্রিকটন ফসল উৎপাদন বাড়বে আশা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, এতে করে শস্য মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আসবে।
পরশুরামে কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী যান ফুলগাজীতে প্রতিষ্ঠিত বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজে। সেখানে অপেক্ষমাণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে বর্তমান ও আগে বিএনপি সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর নারী শিক্ষার প্রসারে প্রথম যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ২০০১ সালে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু করে। সে সরকারের সময় দেশ নকলমুক্ত হয়েছিল।
এসময় শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত মহিলা কলেজটিকে জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে শর্ত জুড়ে দেন ভাল ও গুণগত ফলাফলের। পরে কলেজ মাঠে একটি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
এসব অনুষ্ঠানে পানি সম্পদমন্ত্রী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, সমাজ কল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড জাহিদ হোসেন, কৃষিমন্ত্রী আমিনুর রশিদ এয়াছিন, গৃহায়ন ও গণপুর্তমন্ত্রী জকারিয়া তাহের সুমন, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল, ধর্ম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার, ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন এবং সংরক্ষিক নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু উপস্থিত ছিলেন।




