ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামএকাত্তরে আদিবাসীদের অবদান

একাত্তরে আদিবাসীদের অবদান

মাহমুদ মীর
১৯৭১ সালে সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পার্বত্য অঞ্চলেও এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। সারা দেশে যখন হাজার হাজার মানুষ দল-মত-বর্ণ নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধে অংশ্রগ্রহণ করছে তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসীরাও অসীম সাহসে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

সম্মুখ সমরে নিহত হয়েছেন অনেক অকুতোভয় আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিবাহিনীকে সহযোগিতা করতে গিয়ে নির্মম নির্যাতন ও নৃশংস হত্যার শিকারও হয়েছেন অনেকেই।

মু্ক্তিযুদ্ধের সময় তখনকার মানিকছড়ির মং রাজা মংফ্রু সাইন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মং রাজার তৎকালীন রাজপ্রসাদে প্রতিদিন চট্টগ্রাম হতে ভারতে যাওয়া হাজার হাজার শরণার্থী আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।মুজিবনগর সরকারকে অর্থ সহায়তা, মুক্তিযোদ্ধাদের ত্রিশটিরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র প্রদানসহ কয়েকটি অপারেশনে সফলভাবে বীরত্বের সঙ্গে তিনি যুদ্ধ করেন।
মুক্তিবাহিনীকেও পার্বত্য এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি মূল্যবান পরামর্শ ও অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করেন। তিনি সর্বপ্রথম বিপ্লবী সরকারের হাতে বৈদেশিক মুদ্রা তুলে দেন।

তৎকালীন ইপিআর (বর্তমানে বিজিবি) বাহিনীতে আদিবাসী অনেকজন ছিলেন। তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তারমধ্যে সিপাহী অ্যামি মারমা যুদ্ধে বগুড়ায় নিহত হয়েছিলেন। সিপাহী রমণী রঞ্জনও রামগড়ে নিহত হন। সিপাহী হেমরঞ্জন চাকমা যুদ্ধে নিখোঁজ হয়েছিলেন। পুলিশ কর্মকর্তা খগেন্দ্র লাল চাকমা মুক্তিবাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য্ তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

১নং সেক্টরের আওতায় সর্বপ্রথম ৫ মে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দল গঠনকরা হয়।এই দলের নেতৃত্ব দেন হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরা। পরে এই দলটি কোম্পানিতে পরিণত করলে তিনি কোম্পানি কমান্ডার হন।

পাক বাহিনীরা পার্বত্য জেলা সদর রাঙ্গামাটি ও মহকুমা সদর রামগড় এবং বান্দরবান দখল করার পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে ঘাঁটি স্থাপন করে এবং ঘাঁটিসমূহ সুদৃঢ় করে নেয়। তারা বিভিন্ন এলাকায় শাখা কমিটি গঠন করে তাদের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় রাজাকার বাহিনী গঠন করে এবং বিভিন্ন এলাকায় হানা দিয়ে বর্বর অত্যাচার চালায় ও ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়।পাকবাহিনী রামগড়, গুইমারা, মানিকছড়িসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে পাহাড়ী রমনীদের জোর পূর্বক ধরে নিয়ে অমানুষিকভাবে ধর্ষণ করে এবং ক্যাম্পে উলঙ্গ অবস্থায় বন্দী করে রাখে।

অনেক আদিবাসী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পরে অনেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের কাজ করেন। তাদের মধ্যে তৎকালীন ছাত্রনেতা গৌতম দেওয়ান, এমএন লারমা, রাজা ত্রিদিব রায়ের আপন কাকা কে কে রায়, সুবোধ বিকাশ ত্রিপুরা মুক্তিযুদ্ধে সংগঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, মুক্তিযুদ্ধে স্থানীয় পাহাড়িদের সহযোগিতা ছাড়া দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের জয় সম্ভব হতো না।

পার্বত্য এলাকায় অবস্থানের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচলের সুবিধা, শত্রুপক্ষের ঘাঁটি আক্রমণ এবং পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত নাকাপা, কুমারীপাড়া, পাগলা পাড়া, মানিকছড়ি, ডাইনছড়ি, যোগ্যাছলাও গাড়ীটানা এলাকার গহীন অরণ্যে মুক্তিবাহিনীর গোপন ক্যাম্প বা আশ্রয়স্থল করা হয়। এই সমস্ত গোপন গেরিলা ক্যাম্পে ঐ এলাকার হেডম্যান কার্বারীসহ সকল স্তরের জনগণ খাদ্যশস্য সরবরাহ করত এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন ঐ সমস্ত এলাকার জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে পাকবাহিনীর গতিবিধি এবং তাদের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে সাহায্য করত।

রাজা ত্রিদিব রায়ের এক আত্মীয় লংগদু হতে তিন-চারটি ইঞ্জিন চালিত নৌকায় শ-খানেক খাসি রাংগামাটি পাঠিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা‌দের জন্য। আর সে সময়ে রাংগামাটিতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা‌দের স্থানীয় লোকজন বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন।


পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে যেসব আদিবাসী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তাদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো—
বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ছাত্র-যুবকদের মধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তারা হলেন—
১. মং রাজা মংপ্রু সাইন
২. প্রকৌশলী অমলেন্দু বিকাশ চাকমা
৩. ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট চিত্তরঞ্জন চাকমা
৪. পূর্ব পাকিস্তান ফুটবল টিমের অধিনায়ক চিংহলা মং চৌধুরী মারী
৫. পুলিশ কর্মকর্তা ত্রিপুরা কান্তি চাকমা
৬. পুলিশ কর্মকর্তা বিমলেশ্বর দেওয়ান
৭. পুলিশ কর্মকর্তা খগেন্দ্র লাল চাকমা
৮. উক্য জেন
৯. ক‌র্নেল মনীষ দেওয়ান
১০. রণ বিক্রম ত্রিপুরা


১১. অশোক মিত্র কারবারী
১২. রাস বিহারী চাকমা
১৩. সুশীল দেওয়ান
১৪. নীলোৎপল ত্রিপুরা
১৫. ক্যাচিং মারমা
১৬. সুবোধ বিকাশ ত্রিপুরা
১৭. গোপালকৃষ্ণ দেওয়ান
১৮. মনীন্দ্র কিশোর ত্রিপুরা
১৯. বরেন ত্রিপুরা
২০. কৃপা সুখ চাকমা


২১. আনন্দ বাঁশি চাকমা
২২. সুবিলাশ চাকমা
২৩. রঞ্জিত দেব বর্মন
২৪. কং জয় মারমা
২৫. আক্য মগ
২৬. প্রীতি কুমার ত্রিপুরা
২৭. প্রভুধন চাকমা
২৮. ইউ কে চিং বিবি
২৯. মাংশৈ প্রু মারমা
৩০. মংশৈহ্লা মারমা


৩১. ধুংছাই মারমা
৩২. হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরা
৩৩. করুনা মোহন চাকমা
৩৪. গুলসেন চাকমা
৩৫. বিজয় কুমার চাকমা
৩৬. সাইপ্রু মগ
৩৭. বিজয় কুমার ত্রিপুরা
৩৮. চিত্ত রঞ্জন চাকমা
৩৯. সাথোয়াই মারমা
৪০. ম্নাসাথোয়াই মগ

৪১. মংমং মারমা
৪২. ফিলিপ ‌ত্রিপুরা বিজয়
৪৩. রুইপ্রু মারমা
৪৪. কংচাই মারমা
৪৫. থোয়াইঅং মগ
৪৬. বীর মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা
৪৭. মংসাথোয়াই মগ
৪৮. থোয়াইঅংরী মগ
৪৯. মংশোয়ে অং মগ
৫০. আথুইঅং মগ
৫১. মংমংচিং মগ
৫২. মং আফ্রুশী মগ
৫৩. রবি রশ্মি চাকমা
৫৬. নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা
৫৭. সাথোয়াই মারমা
৫৮. করুণা মোহন চাকমা
ইপিআর সদস্যদের মধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তাদের তালিকা—
৫৯. হাবিলদার নলিনী রঞ্জন চাকমা
৬০. হাবিলদার অমৃত লাল চাকমা
৬১. ল্যান্স নায়েক সঞ্জয় কেতন চাকমা
৬২. ল্যান্স নায়েক স্নেহ কুমার চাকমা
৬৩. সিপাহি চিংমা মারমা
৬৪. ল্যান্স নায়েক মতিলাল চাকমা
৬৫. সিপাহী চাই থোয়াই প্রু মারমা
৬৬. সিপাহী থুই প্রু মারমা
৬৭. সিপাহী কংজা মারমা
৬৮.. সিপাহী মংহলা প্রু মারমা
৬৯. সিপাহী অ্যামি মারমা
৭০. সিপাহী কুল্লিয়ান বম
৭১. সিপাহী জিংপারে বম
৭২. সিপাহী হেম রঞ্জন চাকমা
৭৩. সিপাহী মংচিনু মারমা
৭৪. সিপাহী বুদ্ধিমান ছেত্রী
৭৫. সিপাহী রমণীরঞ্জন চাকমা
৭৬. সিপাহী উক্যজিং মারমা ( বীর বিক্রম)
৭৭. সিপাহী লাল পুম বম
৭৮. নায়েব চিংড়ু মগ
৭৯. ল্যান্স নায়েক অরুন মগ
৮০. ল্যান্স নায়েক অরিন্দ্রা ত্রিপুরা
উল্লেখিত ৮০ জন ছাড়াও আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যাদের নাম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও সমতলের অনেক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যারা বেশ বীরত্বের সাথে লড়াই করে গেছেন।।
পরিসংখ্যান হতে প্রাপ্ত তথ্যমতে, শুধুমাত্র রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানায় ৬২ জন আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধার নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্যদিকে, দিনাজপুরে ওঁরাও ও সাঁওতালদের নিয়ে ১,০০০ জনের বিশাল মুক্তিবাহিনী তৈরি করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, গারো, হাজং ও কোঁচ জনগোষ্ঠী থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকায় যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল প্রায় ১,৫০০ আদিবাসী। গারোদের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার দীপক সাংমো, মহান মুক্তিযোদ্ধা থিওফিল হাজাং, পরিমল দ্রং, অনাথ নকরেক, সেকশন কমান্ডার ভদ্র মারাক, প্লাটুন কমান্ডার যতীন্দ্র সাংমো, কমান্ডার অরবিন্দ সাংমা ও নারী মুক্তিযোদ্ধা ভেরোনিকা সিমসাংয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।


১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ। রংপুরের মিঠাপুকুর, রানীপুকুর, শ্যামপুর, তারাগঞ্জ প্রভৃতি এলাকা থেকে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সমবেত হয় আদিবাসী ও বীরজনতা। তাদের হাতে ছিল লাঠি, খুন্তি, বল্লম ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র। বেশিরভাগই ছিল সাঁওতাল সম্প্রদায়ভুক্ত। সুযোগ বুঝে হানাদার বাহিনী সেদিন বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করেছিল, তাতে মারা যান ২০০ জনের মতো সাঁওতাল বীর। তাদের সম্মানে ঐ স্থানে ২০০০ সালে নির্মাণ করা হয় ‘রক্ত গৌরব’ স্মৃতিসৌধ।
উত্তরবঙ্গ থেকে অন্যান্য যাদের নাম উল্লেখ না করলেই নয়- মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক সাগারাম মাঝি, শহিদ ফাদার মারান্ডি (দিনাজপুর), মুক্তিযোদ্ধা সুরেশচন্দ্র পাহান (নওগাঁ), বিশ্বনাথ মাঝি, বুদু লাকড়া (মিঠাপুকুর, রংপুর), ওঁরাওদের মধ্য থেকে মনাইচন্দ্র খালকো (দিনাজপুর), কশবা মিশন হতে যোগ দেওয়া নারী মুক্তিযোদ্ধা জসপিন ঢপ্প (দশম শ্রেণী, দিনাজপুর) প্রমুখ।
শুধু বীরত্ব নয়, পাকবাহিনীর হিংস্রতা ও লোলুপ দৃষ্টির কবল থেকে মুক্তি পায়নি আদিবাসীরাও। ১৯৭১ সালের মে মাসে মহেশখালি ঠাকুরতলা বৌদ্ধবিহারে ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল হানাদার বাহিনী, হত্যা করেছে অসংখ্য নিরীহ রাখাইন মানুষকে, লুট করেছে ৬২টি রৌপ্যমূর্তি ও অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

আমরা অনেকে কাঁকন বিবির কথা জানি। প্রকৃত নাম ‘কাকাত হেনইঞ্চিতা’, আমরা সহজ করে বলি কাঁকন বিবি।
কিছু আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশ সরকার এখনো সেইভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় নি।

“মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী” বইয়ের তথ্য মতে পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক আদিবাসী যুদ্ধে শহীদ হয়। কিন্তু তাদের অনেকেই তাদের প্রাপ্য সম্মান পাওয়া তো দূরের কথা শহীদের তালিকায় তাদের নাম পর্যন্ত আসেনি।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular