ঢাকা  শনিবার, ১৮ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ৩রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅর্থনীতিএলপিজির বাজারে অস্থিরতা, ক্রেতারা ভুগছেন

এলপিজির বাজারে অস্থিরতা, ক্রেতারা ভুগছেন

নিউজ ডেস্ক:   ঢাকার ধামরাইয়ের কালামপুর গ্রামের লিটন মিয়া। বৃহস্পতিবার সকালে বের হয়েছিলেন ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে। সঙ্গে নিয়েছিলেন ২২০০ টাকা। কিন্তু কয়েক দোকান ঘুরেও সিলিন্ডার কিনতে পারেননি। হতাশ হয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয় তাঁকে।

লিটন মিয়া কিনতে না পারলেও তাঁর গ্রামের বাসিন্দা আনিছুর রহমান আগের দিন সিলিন্ডার কিনেছেন। এ জন্য তাঁকে বাড়তি টাকা দিতে হয়েছে। আনিছুর বলেন, ‘আমি বুধবার পাঁচ দোকান ঘুরে ২ হাজার ৩৫০ টাকায় সিলিন্ডার কিনেছি। তবে দোকানদার অতিরিক্ত দামে বিক্রির কথা কাউকে বলতে নিষেধ করেছেন।’

শুধু ধামরাই নয়, দেশের কমপক্ষে ১৩ জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও বেশি দামেও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি করতে হবে।

সরকারি হিসাবে, আগস্টে দেশে প্রায় এক লাখ ৫৭ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় এক লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। এরপরও রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকার বাজারে সিলিন্ডার নিয়ে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা।

দেশে বছরে এলপিজির চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন। প্রায় এক কোটি গ্রাহক এ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। চাহিদার ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় বাসাবাড়ির রান্নায়। তাই বাজারে সিলিন্ডারের সরবরাহ ও দামের এই অস্বাভাবিকতায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।

কয়েক কোম্পানির হাতে বাজারের বড় অংশ
দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক হলেও নিয়মিত আমদানি করে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি। বাজারের বড় অংশ রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে।

ওমেরা পেট্রোলিয়ামের বাজার হিস্যা ১৯ শতাংশ, পেট্রোম্যাক্সের ১৭, মেঘনা গ্রুপের ১৬ এবং যমুনা স্পেসটেকের ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ এ চার কোম্পানি প্রায় ৬৮ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। বিএম এনার্জির হিস্যা ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আইগ্যাসের ৭ এবং ডেল্টার ৪ শতাংশ।

সেপ্টেম্বরের আমদানিতেও বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য দেখা গেছে। গত শনিবার পর্যন্ত ইউনাইটেড আইগ্যাস ২৩ হাজার ৪৩২ টন, যমুনা স্পেসটেক ২০ হাজার ৬০২, বিএম এনার্জি ১৮ হাজার ২৫২, ওমেরা পেট্রোলিয়াম ১৪ হাজার ৩০১, মেঘনার ফ্রেশ ১৩ হাজার ৪০১ এবং পেট্রোম্যাক্স ১০ হাজার ৬০০ টন এলপিজি আমদানি করেছে। সান গ্যাস আমদানি করেছে আট হাজার ৪০০, এসকেএস চার হাজার এক, টিএমএসএস তিন হাজার ৩০০ এবং প্রিমিয়াম এলপি গ্যাস দুই হাজার ৪৫০ টন।

বেলকুচি উপজেলার সমেশপুর বাজারে যমুনা তেল কোম্পানির ডিলার ইসমাইল হোসেনের মালিকানাধীন সাথী এন্টারপ্রাইজের দোকানে ১২ কেজি এলপিজি গ্যাসের বিক্রয়মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারিত উল্লেখ করে তালিকা টানানো রয়েছে। তবে কিনতে গেলে ২১৫ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া উপজেলা সদরের মুকুন্দগাতী বাজারের শতরুপা স্টোরের মালিক হাবিবুর রহমান হাবিব হোসেন স্থানীয় পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে ১২ কেজি এলপিজি গ্যাস ২১৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

রাজবাড়ীতে বিভিন্ন দোকান ঘুরে অনেক সময় সিলিন্ডার পাচ্ছেন না ক্রেতারা। পাওয়া গেলেও ১২ কেজির সিলিন্ডারের জন্য দিতে হচ্ছে এক হাজার ৮০০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকা। কয়েকটি কোম্পানির সরবরাহ না থাকায় অন্য কোম্পানির ওপর চাপ বেড়েছে।

কুড়িগ্রামে প্রায় এক মাস ধরে ওমেরা, বসুন্ধরা ও যমুনা ব্র্যান্ডের গ্যাসের সরবরাহ নেই বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তাদের হিসাবে, প্রতিটি কোম্পানি মাসে গড়ে সাত থেকে আট হাজার সিলিন্ডার প্রয়োজন। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় মজুত থাকা সিলিন্ডারও বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।

মৌলভীবাজারে সংকটের পাশাপাশি বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে। জেলার ডিস্ট্রিবিউটরদের অধিকাংশই কম সরবরাহ পাচ্ছে। বাজারে ওরিয়ন ও টোটাল গ্যাসের সংকট রয়েছে। আইগ্যাস, পেট্রোম্যাক্স, ওমেরা ও ফ্রেশের ১২ কেজির সিলিন্ডার খুচরায় এক হাজার ৯৫০ থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানির সিলিন্ডারের দাম উঠেছে দুই হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত।

নওগাঁর রাণীনগরেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানির সিলিন্ডার এক মাস ধরে না আসায় স্থানীয় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। লালমনিরহাটে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা দামের সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬২০ থেকে ১ হাজার ৬৭০ টাকায়। এ ছাড়া নরসিংদী, খুলনা, বরগুনা, নাটোর, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও লালমনিরহাটেও প্রায় একই রকম চিত্র পাওয়া গেছে।

বুধবার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে অনলাইন সভায় জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখে তথ্যপ্রমাণসহ প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, কৃত্রিম সংকট বা বিইআরসি নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার লোয়াবও অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির নির্দেশ দিয়েছে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular