ঢাকা  বুধবার, ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeআন্তর্জাতিকযুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি ইরানকে

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি ইরানকে

নিউজ ডেস্ক : ইরানের ওপর নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ তৈরির ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ওয়াশিংটন তেহরানের বিরুদ্ধে “ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা” আরোপ করবে। তাঁর দাবি, এই অর্থনৈতিক চাপ এতটাই ব্যাপক হবে যে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রয়োজন কমে আসতে পারে।

বৃহস্পতিবার দেওয়া বেসেন্টের বক্তব্য আসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ হুমকি দেওয়ার একদিন পর। ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া দেশ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। বেসেন্ট জানিয়েছেন, নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত আগামী সপ্তাহে প্রকাশ করা হবে।

সামরিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক যুদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপের কৌশলের আরও কঠোর সংস্করণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বেসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য শুধু ইরানের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করা নয়; বরং দেশটির সঙ্গে ব্যবসা করা অন্যান্য রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানকেও ওয়াশিংটনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে বাধ্য করা।

বিশেষ করে ইরানের তেল কেনা, অর্থ স্থানান্তর এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত দেশ ও কোম্পানিগুলো নতুন ব্যবস্থার আওতায় পড়তে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা অব্যাহত রাখলে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ও সরকার সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তাদের পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।

এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ক্রেতা চীন নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এ অবস্থায় ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

হরমুজ প্রণালিও কৌশলের কেন্দ্রে

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ঘিরে পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটি দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের নজরে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে বিদ্যমান নৌ অবরোধকে সমন্বয় করে ইরানের তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক আয় আরও সীমিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

বেসেন্টের বক্তব্যে অর্থনৈতিক চাপকে এমন একটি কৌশল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যার মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়নের সামর্থ্য কমিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তেহরানকে রাজনৈতিক সমঝোতার দিকে ঠেলে দেওয়াও এর অন্যতম লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরানের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

ইরান ইতোমধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। নতুন পদক্ষেপ সেই চাপ আরও বাড়াতে পারে।

তবে নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। ইরান অতীতেও নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বিকল্প বাণিজ্যপথ, আর্থিক ব্যবস্থা এবং তেল রপ্তানির গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে। ফলে নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু ইরানের ওপর নয়, তৃতীয় দেশের ব্যবসা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নজরদারি বাড়াতে হতে পারে।

ইরানকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক চাপের ঘোষণা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও দামের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার খবরের পাশাপাশি ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনা তেলের বাজারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা ধরে রাখা। চীনসহ বড় বাণিজ্যিক অংশীদাররা যদি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে অনাগ্রহী হয়, তাহলে এর বাস্তবায়ন আরও জটিল হতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত চাপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

আগামী সপ্তাহে স্পষ্ট হবে নিষেধাজ্ঞার রূপ

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থার বিস্তারিত আগামী সপ্তাহে ঘোষণা করা হবে। ফলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কোন কোন খাত, দেশ, কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে এবং সেগুলো বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র কতটা কঠোর হবে।-

সব মিলিয়ে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপ কেবল একটি নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ নয়; বরং সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর প্রভাব ইরানের অর্থনীতি ছাড়িয়ে তেলবাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনীতিতেও পড়তে পারে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular