ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত একদিকে যেমন উন্নয়নের গল্প শোনায়—নতুন হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, বিশেষায়িত চিকিৎসা—অন্যদিকে এর অন্দরমহলে নীরবে গড়ে উঠেছে এক জটিল ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার কেন্দ্রে রয়েছে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের অস্বাভাবিক প্রভাব, চিকিৎসা ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ, এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা।
প্রথমেই একটি বাস্তব দৃশ্য কল্পনা করুন। একজন রোগী সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, কষ্টে, উদ্বেগে, আশায়—ডাক্তারের কাছে একটু সময় পাওয়ার জন্য। কিন্তু সেই লাইনের মাঝেই হঠাৎ দেখা যায়, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা (মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ) সরাসরি ডাক্তারের চেম্বারে প্রবেশ করছেন, তাদের জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ, আলাদা গুরুত্ব। রোগীর অপেক্ষা যেন এখানে গৌণ, আর বাণিজ্যিক যোগাযোগই হয়ে উঠছে মুখ্য।
এই পরিস্থিতি কেবল বিচ্ছিন্ন নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি “স্বাভাবিক প্রক্রিয়া” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। প্রতিনিধিরা ডাক্তারদের কাছে নতুন ওষুধের প্রচার করছেন—এটি স্বাভাবিক পেশাগত যোগাযোগের অংশ হতে পারে। কিন্তু যখন সেই প্রচার উপঢৌকন, বিদেশ ভ্রমণ, আর্থিক সুবিধা, কিংবা সরাসরি কমিশনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সেটি আর পেশাগত থাকে না—এটি পরিণত হয় স্বার্থের সংঘাতে (conflict of interest)।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূলনীতি হলো—রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন প্রেসক্রিপশন নির্ধারিত হয় বাণিজ্যিক চুক্তির ভিত্তিতে, তখন সেই নীতিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ নয়, বরং নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ লেখার প্রবণতা বাড়তে থাকে। এর ফলে একটি রোগের জন্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে একাধিক ওষুধ, একই কার্যকারিতার ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ড, কিংবা অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক পর্যন্ত প্রেসক্রিপশনে ঢুকে পড়ে। এর পরিণতি বহুমাত্রিক।
প্রথমত, অর্থনৈতিক চাপ। বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষ স্বাস্থ্যখাতে ‘out-of-pocket expenditure’-এর উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ নিজের পকেট থেকেই চিকিৎসার খরচ বহন করতে হয়। যখন একটি প্রেসক্রিপশনে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ৮-১০টি ওষুধ থাকে, তখন একজন নিম্ন বা মধ্যবিত্ত রোগীর জন্য তা বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই পুরো কোর্স শেষ করতে পারেন না, আবার কেউ কেউ ওষুধই কেনেন না—ফলে চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যঝুঁকি। অতিরিক্ত ওষুধ গ্রহণ মানেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি হচ্ছে—যা ভবিষ্যতের জন্য একটি বৈশ্বিক হুমকি। একই সঙ্গে বহু ওষুধ একসঙ্গে খাওয়ার ফলে drug interaction-এর ঝুঁকিও বাড়ে, যা অনেক সময় মারাত্মক হতে পারে।
তৃতীয়ত, নৈতিক অবক্ষয়। যখন একজন রোগী বুঝতে পারেন যে তার চিকিৎসা হয়তো পুরোপুরি তার কল্যাণের জন্য নয়, বরং কোনো বাণিজ্যিক প্রভাবের ফল—তখন চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়। আস্থা হারিয়ে গেলে চিকিৎসা ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যায়, এবং মানুষ বিকল্প, অনেক সময় অবৈজ্ঞানিক পথের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
চতুর্থত, তথ্যের অপব্যবহার। রোগীর প্রেসক্রিপশন গোপনীয় নথি হওয়া সত্ত্বেও সেটি টেনে নিয়ে ছবি তোলা, বিশ্লেষণ করা, এবং কোম্পানির কাছে পাঠানো—এটি কেবল অনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তারও লঙ্ঘন। স্বাস্থ্যতথ্য একটি সংবেদনশীল বিষয়; এর এমন ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এই পরিস্থিতির জন্য একটি “system দায়ী, অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই একটি “systemic problem” প্রোথিত। ওষুধ কোম্পানিগুলো মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিযোগিতায় নেমেছে; ডাক্তারদের একটি অংশ সেই প্রলোভনে প্রভাবিত হচ্ছেন; তদারকি সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা সীমিত; এবং রোগীরা সচেতনতার অভাবে অনেক কিছু মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সমাধানও তাই বহুমাত্রিক হতে পারে।
প্রথমত, কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা প্রয়োগ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে স্পষ্টভাবে গাইডলাইন নির্ধারণ করতে হবে—ডাক্তার ও ওষুধ কোম্পানির সম্পর্কের সীমা কোথায়। উপঢৌকন, আর্থিক সুবিধা, কিংবা কমিশনভিত্তিক প্রেসক্রিপশন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং তা লঙ্ঘনের জন্য কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, হাসপাতালভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে নির্দিষ্ট সময় ছাড়া কোনো ওষুধ প্রতিনিধি যেন ডাক্তারের চেম্বারে প্রবেশ করতে না পারেন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। রোগীর সময়ই এখানে অগ্রাধিকার পাবে—এটি একটি মৌলিক নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রেসক্রিপশন অডিট। নিয়মিতভাবে ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন পর্যালোচনা (audit) করা যেতে পারে—অপ্রয়োজনীয় ওষুধ, অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক, বা নির্দিষ্ট কোম্পানির প্রতি অস্বাভাবিক ঝোঁক আছে কিনা তা যাচাই করার জন্য। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
চতুর্থত, চিকিৎসকদের নৈতিক প্রশিক্ষণ জোরদার করা। মেডিকেল শিক্ষায় ‘medical ethics’ শুধু তাত্ত্বিক নয়, বাস্তবভিত্তিকভাবে প্রয়োগযোগ্য করে তুলতে হবে। চিকিৎসককে মনে রাখতে হবে—তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত একজন মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
পঞ্চমত, রোগীর সচেতনতা বৃদ্ধি। রোগীদের জানতে হবে—কেন এই ওষুধটি দেওয়া হয়েছে, এর বিকল্প আছে কিনা, জেনেরিক নাম কী। প্রশ্ন করার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। সচেতন রোগীই পারে এই চক্রকে দুর্বল করতে।
সবশেষে, এটি কেবল একটি পেশাগত সমস্যা নয়—এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক সংকট। চিকিৎসা যদি
বাণিজ্যের কাছে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে, তাহলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা তার মানবিকতা হারাবে। আর মানবিকতা ছাড়া চিকিৎসা কেবল একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া—যেখানে রোগী নয়, মুনাফাই হয়ে ওঠে মূল লক্ষ্য।
লেখক— শিক্ষক ও কলাম লেখক




