বিশেষ প্রতিবেদক: চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব আয় বেড়েছে। তবে এই তিন মাসের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি গুরুত্বপূর্ণ এই শুল্ক স্টেশনটি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ২২ হাজার ৮৩ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছে। এই সময়ের জন্য রাজস্ব আদায়ে ৩২ হাজার ৩২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
সে হিসেবে এই তিন মাসে চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব আদায়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। তবে তার আগের বছর এই তিন মাসে কাস্টমস ১৯ হাজার ৯০২ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছিল। তাই বলা যায়, বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আয় বাড়লেও রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি কাস্টমস।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, রাজস্ব আদায় মূলত আমদানি করা পণ্যের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। সে হিসেবে, বিগত তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রাজস্ব আদায়ে এই ঘাটতির পেছনে সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি কমে যাওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে ৯৪ দশমিক ৭৩ লাখ টন আমদানি পণ্য খালাস হয়েছে। তার বিপরীতে চলতি অর্থবছরের তিন মাসে খালাস হয়েছে ৯০ দশমিক ৮৪ লাখ টন আমদানি পণ্য। মাসটিতে আমদানির পরিমাণ কমায় আমদানির শুল্কায়নযোগ্য মূল্যও ২.৯৮ শতাংশ কমেছে।
রাজস্ব আদায়ে এই ঘাটতির মূল কারণ সেপ্টেম্বরে কাস্টম হাউসের মাধ্যমে মোট আমদানির পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ৪.১ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি আমদানির শুল্কায়নযোগ্য মূল্যও ২.৯৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা।
মাসটিতে শুল্ক স্তরভিত্তিক রাজস্ব আদায়ের চিত্রেও রয়েছে ভিন্নতা। ২৫ শতাংশ শুল্ক ক্যাটাগরির আমদানিতে রাজস্ব আদায় আগের বছরের তুলনায় ২১ শতাংশ কমে ২ হাজার ৩৩ কোটি টাকায় নেমেছে। অপরদিকে ৩ শতাংশ শুল্ক ক্যাটাগরির আমদানি থেকে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ২৪১ শতাংশ।
তা ছাড়া ১০ শতাংশ শুল্ক ক্যাটাগরির আমদানি থেকে ১ হাজার ৩৩৬ কোটি, ৫ শতাংশ ক্যাটাগরি থেকে ৮৭৩ কোটি ৪০ লাখ, ১৫ শতাংশ ক্যাটাগরি থেকে ৫৯০ কোটি, শূন্য শতাংশ ক্যাটাগরি থেকে ৮০৪ কোটি এবং ১ শতাংশ ক্যাটাগরি থেকে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা আদায় হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ আল আমীন জানান, রাজস্ব আদায় মূলত আমদানির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। সেপ্টেম্বরে আমদানির পরিমাণ কম, তাই রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। প্রথম প্রান্তিকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঘাটতি থাকলেও আগামী মাসগুলোতে এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র। এই বন্দরের মাধ্যমে আমদানি করা পণ্যের পরিমাণ, মূল্য ও শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন সরাসরি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আদায়ে প্রভাব ফেলে। প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আয়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পরবর্তী মাসগুলোতে আমদানি কার্যক্রমের গতি এবং উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানির ওপর রাজস্ব আয়ের অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, অনেক অসাধু ব্যবসায়ী ভুয়া কাগজপত্র বা শুল্কায়ন দেখিয়ে পণ্য খালাস করার চেষ্টা করে। এই দুর্নীতি কখনো ধরা পড়ে, আবার কখনো ধরা পড়ে না।
অনেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যে রাজস্ব দিতে হয়, বিভিন্ন লবিং করে ওই অর্থ কমিয়ে আনতে চায়। এসব কারণে কাস্টমসের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সব সময় ঘাটতি থাকে। অর্থবছর শেষ হলে দেখা যায়, কাস্টমস রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে না।
তাই কাস্টমসের কাজকে শতভাগ ডিজিটালাইজ করতে হবে। যারা শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে, তাদের কঠোর আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এগুলো নিশ্চিত করা না গেলে এসব সমস্যার সমাধান কখনোই করা সম্ভব হবে না। এই রাজস্ব ঘাটতি সব সময় থেকে যাবে। এতে দেশের ক্ষতি হবে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মো. মুসা বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টমস আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। রাজস্ব আদায় ও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করে থাকে। এটা বলাই যায়। তবে রাজস্ব ফাঁকির মতো ঘটনা যেন না ঘটে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কাস্টমস ব্যবস্থাপনায় আরও পরিবর্তন আনা জরুরি। তাহলে রাজস্ব আদায়ে যে ঘাটতি সেটা পূরণ করা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টমসের ব্যাপক কর্মকাণ্ড জড়িয়ে আছে। কাস্টমস হাউসের রাজস্ব আদায়ে একটি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
তিনি বলেন, এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ তা অনেকাংশে আমদানির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সেভাবে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। রাজস্ব ফাঁকি যেন না দিতে পারে সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। তাহলে ঘাটতিটা পূরণ করা সম্ভব হবে। দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও গতিশীল হবে বলে আমরা মনে করি।




