ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeআন্তর্জাতিকজেন-জি আন্দোলনে সেনাবাহিনী বিদ্রোহ, মাদাগাস্কারের রাষ্ট্রপতি দেশ ছেড়ে পালালেন

জেন-জি আন্দোলনে সেনাবাহিনী বিদ্রোহ, মাদাগাস্কারের রাষ্ট্রপতি দেশ ছেড়ে পালালেন

নিউজ ডেস্ক : দীর্ঘমেয়াদি পরিষেবা-অভাব ও দুর্নীতি-বিরোধী ‘জেন জেড’ তরুণ আন্দোলন ও সেনা বিদ্রোহের জেরেই রাষ্ট্রপতি আন্দ্রে নিরিনা রাজোয়েলিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।

ছবি : সংগৃহিত।

২৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও পানির তীব্র ঘাটতির প্রতিবাদে মাদাগাস্কারের রাজধানী আন্তানানারিভোতে তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন শুরু হয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও সেবাবঞ্চনার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ক্ষোভ, এই বিক্ষোভ পরিণত হয় -ব্যাপক গণআন্দোলনে। আন্দোলনকারীরা রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্তি, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং দুর্নীতি দমনসহ ব্যাপক সংস্কারের দাবি তুলেছে।

পশ্চিমা মহলসহ গণমাধ্যম এ আন্দোলনকে নাইজেরিয়া, নেপাল বা ইন্দোনেশিয়ায় তরুণ-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের অনুরণন বলে দেখেছে।

ঘটনা প্রবাহ :
২৫ সেপ্টেম্বর: বিদ্যুৎ-জল সংকটে স্থানীয় কাউন্সিলরদের গ্রেপ্তার সংবাদে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। তরুণরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে।

২৯ সেপ্টেম্বর: বিক্ষোভ থামাতে রাষ্ট্রপতি রাজোয়েলিনা তাঁর মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। তবে আন্দোলন থামেনি, বরং পরিবর্তন-সৃষ্টির দাবিতে বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়।

২ অক্টোবর: জেন জেড আন্দোলন ঘোষণা করে, যতদিন প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনা পদত্যাগ করবেন না, আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তারা সরকারকে ‘মাফিয়া’ খণ্ডেও অভিহিত করে নেতাদের পরিবর্তনের ডাক দেয়।

রুফিন ফোর্টুনাত জাফিসাম্বো। ছবি : সংগৃহিত।

৬ অক্টোবর: ক্ষমতা-সংকট মোকাবিলায় রাজোয়েলিনা সেনাপ্রধান রুফিন ফোর্টুনাত জাফিসাম্বোকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। মন্ত্রিসভার বড় পরিবর্তনের এই উদ্যোগেও শান্তি ফিরতে পারে না।

১১ অক্টোবর: বিশেষ বাহিনী ক্যাপসাট (CAPSAT) বিক্ষোভে যোগ দিয়ে সরকারি বাহিনীতে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা জানায়, তারা আর সাধারণ জনতার বিরুদ্ধে গুলি করবে না, তার পরিবর্তে জনতার পক্ষে থাকবে।

১২ অক্টোবর: ক্যাপসাট নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ করে, যার পর দিন রাজোয়েলিনা সিন্ডিকেটকে ‘ক্ষমতা দখলের চেষ্টা’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ অভ্যুত্থান’ বলে অভিযোগ তোলেন।

১৩ অক্টোবর: প্রেসিডেন্ট রাজোয়েলিনা একটি ফরাসি সামরিক বিমানে ফ্রান্সের আশ্রয়ে দেশ ত্যাগ করেন। এই ঘটনায় জাতীয় নিরাপত্তা শূন্য এবং বিরোধী শিবিরে অভ্যুত্থানের অঘোষিত সূচনা হয়। একই দিনে সিনেট প্রধানের পদ থেকে জাঁ অঁদ্রে নড্রেমনজারি বহিষ্কৃত হন এবং তিনি সাময়িক রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পান। পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সিনেটের প্রধান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের ভার গ্রহণ করবেন।

ছবি : সংগৃহিত।

রাষ্ট্রপতি রাজোয়েলিনার বক্তব্য ও অভিযোগ : বিক্ষোভ বিরোধী প্রচেষ্টায় প্রতিকূলতার মুখে রাজোয়েলিনা একাধিক ভাষণে বক্তব্য দেন। তিনি সরকারের পতনের কবল থেকে প্রতিশোধ নিয়ে বসার ষড়যন্ত্রকারী শক্তি ব্যাখ্য দেন এবং নিহতদের নিয়ে সরকারের তথ্য অস্বীকার করেন।

এক প্রচারে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, “নিশ্চিত প্রাণহানি ১২ জনের, তাঁরা সকলেই ডাকাত ও ভাংচুরকারী”। সেনা বিদ্রোহকে ‘ক্ষমতা দখলের চেষ্টার অবৈধ অভিযান’ আখ্যায়িত করে তিনি আন্দোলনকারীদের কূটকৌশল বলে অভিহিত করেছেন। তীব্র বিদ্যুৎ–জল সমস্যার জন্য সাধারণ মানুষের কষ্ট বুঝে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছেন এবং তরুণদের সাথে সমালোচনামূলক সংলাপের আশ্বাস দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি রাজোয়েলিনা মাদাগাস্কারে বিক্ষোভের উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি সহযোগিতার সন্ধান করেন। ফরাসি রাষ্ট্র-রেডিও আরএফআই এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তার ফরাসি নাগরিকত্ব প্রয়োগ করে ফরাসি সামরিক বিমানে করে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছেন।

আরো পড়ুন : জেন-জি আন্দোলনে মাদাগাস্কারে সরকার ভেঙে দিলেন প্রেসিডেন্ট রাজোয়েলিনা

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর সঙ্গে অজানা চুক্তির পর তিনি Sainte Marie বিমানবন্দরে নেমে ফ্রান্স বিমানবাহিনীর সহযোগিতায় দেশ ছাড়েন; পরে ধারণা করা হয় তিনি দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।

এসময় মাদাগাস্কারের বাসিন্দারা আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগপ্রকাশ করছেন এবং অবিলম্বে নতুন নির্বাচন দাবি করছেন।

বিরোধী শিবিরের নেতা সিতেনে র্যান্ড্রিয়ানাসোলোনাইকো জানান, তিনি প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়েছেন রাজোয়েলিনা দেশ ত্যাগ করেছেন। তার কথায়, “প্রেসিডেন্সির কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে তারা নিশ্চিত করেছে যে রাষ্ট্রপতি ইতিমধ্যেই দেশ ছেড়েছেন,” এবং তার অবস্থান বর্তমানে অজানা।

অন্যদিকে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মার্ক রাভালোমানানা শিবিরের সমর্থনে রাজধানীর বিক্ষোভ সভায় উপস্থিত ছিলেন। অসংলগ্ন পরিস্থিতিতে সিনেটের প্রধান পরিষদ বদলানো হয়েছে এবং জাঁ অঁদ্রে নড্রেমনজারি সাময়িক রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। পরিস্থিতি টালমাটাল; সরকার নেই এবং নেতাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা বিরাজ করছে।

ছবি : সংগৃহিত।

অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতায় সাধারণ যুবকরা ক্ষোভ ও আশা ব্যক্ত করেছেন। ২২ বছর বয়সী এক হোটেল কর্মী অ্যাড্রিয়ানারিভনি ফানোমেগানৎসো বলেন, তাঁর মাসিক প্রায় ৩০০,০০০ আরিয়ারি (৬৭ ডলার) বেতন প্রয়োজনীয় খাবার যোগাড় করতেও যথেষ্ট নয়; “১৬ বছরে রাষ্ট্রপতি ও তাঁর সরকার নিজেদের ছাড়া আর কাউকে কিছু করেনি, সাধারণ মানুষ গরীবেই থেকে গেছে, আর তরুণরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার”।

অন্যদের মতে, প্রায় ৩০ মিলিয়ন মানুষের দেশে মাত্র এক-তৃতীয়াংশই বিদ্যুৎ পায় এবং অপ্রতুল জন জীবনের এই সংগ্রামে নেতৃত্বশূন্য জনগণ আরও উত্তেজনায় আছে।

২৫ সেপ্টেম্বর: বিদ্যুৎ ও পানির ঘাটতি নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।

২৯ সেপ্টেম্বর: রাজোয়েলিনা তৎপরতা দেখিয়ে সরকার বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

২ অক্টোবর: বিক্ষোভকারীরা জানান, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ না করলে শান্তি নেই।

৬ অক্টোবর: নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সেনাপ্রধান জাফিসাম্বো নিয়োগের ঘোষণার পরও উত্তেজনা অব্যাহত থাকে।

১১ অক্টোবর: সেনা বিশেষ বাহিনী ক্যাপসাট (CAPSAT) বিক্ষোভে যোগ দিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

১২ অক্টোবর: রাজোয়েলিনা সেনা পদক্ষেপকে ‘ক্ষমতা দখলের চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেন।

১৩ অক্টোবর: রাষ্ট্রপতি ফরাসি সামরিক বিমানে দেশ ত্যাগ করেন। সিনেট বদলে নতুন সাময়িক রাষ্ট্রপতি মনোনীত হন।

সূত্রঃ বিশ্বস্ত গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রকাশিত রিপোর্ট (গার্ডিয়ান, রয়টার্স, আলজাজিরা) থেকে সংগৃহীত তথ্য।

ঢাকানিউজ২৪/মহফ

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular