নিজস্ব প্রতিবেদক: দুর্নীতি বিরোধী কৌশলপত্র প্রণয়ন, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা, ঘুষ লেনদেনকে অবৈধ ঘোষণার প্রস্তাবসহ ৪৭ দফা সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশন।
বুধবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ করেছে এ কমিশন।
জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত এই সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের কথা বলে আসছে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুই ধাপে ১১টি সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গত ৩ অক্টোবর নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ও সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।
সবগুলো কমিশনকে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৯০ দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। এই ছয় সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও, পরবর্তীতে কমিশনগুলো সময় বাড়িয়ে নেয়।
বিচার বিভাগ সংস্কার ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় আরও একবার বাড়ানো হয়েছে।
বাকি চারটি কমিশন- নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন আজ জমা দেওয়া হলো।
গত ৩ অক্টোবর ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বে দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে দুদককে শক্তিশালী করতে ৪৭ সুপারিশ করা হয়েছে।
সুপারিশগুলো হলো-
দেশে জাতীয় দুর্নীতিবিরোধী কোনো কৌশল নেই। দুর্নীতি দমন শুধু দুদকের একার কাজ নয়, এখানে রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় অনেক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে।
কমিশন বলছে, ব্যক্তি একটি প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থ ও বন্ধুত্বের বলয় থেকে সিদ্ধান্ত নেন। এটা বন্ধে স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিরাসন আইন দরকার।
সুনির্দিষ্ট কিছু আইন না থাকায় অর্থ পাচার বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে মনে করে সংস্কার কমিশন। তারা আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী শেল কোম্পানির মালিকানা জাতীয় রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে।
এতে বলা হয়, বেসরকারি খাতে ঘুষ নিষিদ্ধ করা নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের প্রত্যেক নাগরিকের দেশ-বিদেশে থাকা ব্যাংক হিসাবের লেনদেন ‘কমন রিপোর্টি প্র্যাকটিস’–এর আওতায় আনার কথা বলেছে কমিশন। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব লেনদেনের তথ্য জানতে পারবে। এটি বার্ষিক প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করতে হবে। ১২২টি দেশ ইতিমধ্যে ওই প্র্যাকটিসের অধীন এসেছে।
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জন্য সুপারিশ
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশকিছু সুপারিশ করেছে দুদক। এর মধ্যে রয়েছে:
রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী আয়-ব্যয় নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে।হলফনামার তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
যদি হলফনামায় পর্যাপ্ত তথ্য না থাকে, তথ্য গোপন করা হয় ও বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ থাকে, তবে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় থেকে জাতীয়—সব পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তাঁদের পরিবারের সবার সম্পদের বিবরণী নির্বাচন কমিশনে জমা দেবেন। সেটি নির্বাচন কমিশন প্রকাশ করবে। এটি প্রতিবছর হালনাগাদ করতে হবে, যত দিন তারা জনপ্রতিনিধি থাকবেন।
দুদককে শক্তিশালী করার জন্য প্রতিষ্ঠানটি যা বলেছে:
দুর্নীতির তথ্য প্রকাশকারীর সুরক্ষা আইন।
যে দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করেন, তার সুরক্ষায় আইন করতে হবে।
একটা তথ্য প্রকাশ সুরক্ষা আইন রয়েছে, তবে সেটির কোনো প্রয়োগ ও কার্যকর প্রচার নেই। এ আইন যথেষ্ট নয়। তাই আইনটি সংশোধন করে কার্যকর ও প্রচার করার সুপারিশ করা হয়েছে।
দুদকে নিয়োগের ক্ষেত্রে পেশাগত বৈচিত্র্য থাকা দরকার। দুদকে শুধু আমলাদের নিয়োগে যে প্রধান্য দেওয়া হয়, তা থেকে সরে আসতে হবে।
বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে একজন নারীসহ পাঁচজন দুদক কমিশনার নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের মেয়াদ হবে চার বছর।
দুদক যে কাজ করবে, তার জবাবদিহি থাকবে। ভালো কাজের যেমন প্রশংসা থাকবে, তেমন কাজ করতে না পারলে জবাবদিহি করতে হবে।
দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে যে সার্চ কমিটি রয়েছে, সেটিকে সার্চ ও পর্যবেক্ষণ কমিটি করতে হবে।
সার্চ কমিটির দুটি দায়িত্বের সুপারিশ করা হয়েছে। এর একটি, নিয়োগে যাচাই-বাছাই করা। অন্যটি, কমিশন কী কাজ করছে, সেটি পর্যবেক্ষণ করে ছয় মাস পরপর প্রতিবেদন দেওয়া।
রাজনৈতিক বিবেচনায় দুদকে নিয়োগ বন্ধে সাত সদস্যের বাছাই কমিটি করার সুপারিশ করেছে সংস্কার কমিশন।
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, পরে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তি যিনি রয়েছেন, তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাছাই কমিটির প্রধান করার কথা বলা হয়েছে।এরপর সদস্য হবেন হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ), সংসদ নেতার মনোনীত একজন, প্রধান বিরোধীদল থেকে মনোনীত একজন।
এ ছাড়া একজন সরাসরি প্রধান বিচারপতি থেকে নিযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে, যার দুর্নীতিবিরোধী কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
দুদককে আমলাতন্ত্র মুক্ত করতে সচিব, মহাপরিচালক ও পরিচালক—পদগুলোতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
দুদকে শৃঙ্খলা অনুবিভাগ রাখতে হবে। এটির দায়িত্ব হবে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে বরখাস্ত করা। কেউ যাতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে না পড়েন, সে জন্য কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে নজরদারি অব্যাহত রাখার সুপারিশও করেছে কমিশন।



