নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগে অগ্রগতি হলেও নিয়োগে স্বচ্ছতা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও সম্ভাব্য সিন্ডিকেট নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে দুই দেশের শ্রমবাজারে একাধিকবার নিয়োগ চালু ও বন্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতায় এবারও মূল প্রশ্ন—নতুন ব্যবস্থায় কর্মীরা কি সত্যিই কম খরচে ও নিরাপদে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন?
সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত গ্লোবাল ভয়েসেস-এর এক বিশ্লেষণে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের দীর্ঘ ইতিহাস, অভিবাসন ব্যয়, ঋণের বোঝা ও নতুন নিয়োগব্যবস্থার অনিশ্চয়তার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
গত ৩০ আগস্ট বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছিলেন, ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২ লাখ কর্মী নেবে মালয়েশিয়া এবং সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কর্মী যাওয়া শুরু হতে পারে।
তবে দুই দিন পর মালয়েশিয়ার সরকারি মুখপাত্র ও যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল স্পষ্ট করেন, ২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার বক্তব্যটি কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি অবস্থান নয়।
ফলে ঠিক কতজন বাংলাদেশি কর্মী নতুন পর্যায়ে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ ‘জিরো-কস্ট’ বা অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই নেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে। প্রথম দলটিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় মালয়েশিয়া সরাসরি বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করেছে। আরও ৩১২টি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটিং এজেন্সি’ হিসেবে কাজ করবে। রাষ্ট্রায়ত্ত বোয়েসেলসহ মোট ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা।
তবে ৩১২ সহযোগী এজেন্সির ভূমিকা এবং মালয়েশিয়ার Foreign Workers Centralised Management System (FWCMS)-এ তাদের সরাসরি প্রবেশাধিকার থাকবে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রিক্রুটিং এজেন্সির একটি অংশের দাবি, ২৫টি মূল এজেন্সির মাধ্যমে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ করতে হলে আবারও নিয়ন্ত্রণ সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোও কর্মীর চাহিদাপত্র সংগ্রহ ও নিয়োগে অংশ নিতে পারবে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজার সহযোগিতার ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৯২ সালে দুই দেশ শ্রমিক পাঠানোর জন্য চুক্তি করে। ১৯৯৪ সালের আরেক ব্যবস্থায় প্রধানত নির্মাণ খাতে বছরে ৫০ হাজার কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৭ হাজার বাংলাদেশিকে মালয়েশিয়ায় কাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
অনিয়ম ও অননুমোদিত অভিবাসনের অভিযোগের মধ্যে ১৯৯৭ সালে নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়।
অভিবাসন ব্যয় ও অনিয়ম কমাতে ২০১২ সালে সরকার-টু-সরকার বা জিটুজি পদ্ধতি চালু হয়। প্রাথমিকভাবে পাম অয়েল খাতে প্রায় ৩০ হাজার কর্মী নেওয়ার লক্ষ্য ছিল। এতে ১৪ লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করলেও প্রত্যাশিত সংখ্যায় কর্মী পাঠানো সম্ভব হয়নি।
২০১৬ সালে ‘জিটুজি প্লাস’ চালুর পর মাত্র ১০টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচিত হয়। নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় প্রায় ৩৭ থেকে ৪০ হাজার টাকা হলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে কর্মীদের প্রকৃত ব্যয় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকায় পৌঁছানোর তথ্য উঠে আসে। সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগের পর ২০১৮ সালে আবার নিয়োগ স্থগিত করে মালয়েশিয়া।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে নতুন সমঝোতা স্মারকের পর শ্রমবাজার আবার চালু হয়। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০১টি এজেন্সির মাধ্যমে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যান। কিন্তু উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, অনিয়ম ও কর্মীদের চাকরি না পাওয়ার অভিযোগের মধ্যে ২০২৪ সালের মে মাসের শেষে নতুন কর্মী প্রবেশ আবার বন্ধ হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ অভিবাসন ব্যয় নিয়ে। আগের নিয়োগপর্বে মালয়েশিয়ায় যেতে সরকার নির্ধারিত ব্যয় ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। কিন্তু সাম্প্রতিক কর্মীদের গড় ব্যয় প্রায় ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা হওয়ার তথ্য এসেছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে মালয়েশিয়াগামী কর্মী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে বাংলাদেশ ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করে। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ২ লাখ ৬৭ হাজার ২৭৬ কর্মী পাঠিয়ে নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত ৪ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকার বেশি আদায়ের অভিযোগ উঠে আসে।
নতুন নিয়োগব্যবস্থাতেও খরচ ৬ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্ট কেউ কেউ। তবে এটি এখন পর্যন্ত একটি আশঙ্কা; সরকার নতুন পর্যায়ের চূড়ান্ত অভিবাসন ব্যয় ঘোষণা করেনি।
অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় শুধু মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য উদ্ধৃত করে গ্লোবাল ভয়েসেস জানিয়েছে, বিদেশগামী একজন কর্মীর গড় নিয়োগ ব্যয় ছিল প্রায় ৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। বিপরীতে গড় মাসিক আয় প্রায় ৪২ হাজার ৫৯৯ টাকা হওয়ায় শুধু অভিবাসন ব্যয় তুলতেই গড়ে প্রায় ১০.৯ মাসের আয়ের প্রয়োজন হয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকারবিষয়ক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান Verité-এর বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া অভিবাসন করিডর নিয়ে গবেষণায় একজন কর্মীর গড় নিয়োগ ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ডলার পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া কর্মীদের ৭৩ শতাংশ তাঁদের মাসিক বেতনের অন্তত অর্ধেক নিয়োগসংক্রান্ত ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছেন; ৪৩ শতাংশ মজুরি নিয়ে প্রতারণার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) গবেষণাতেও দালাল ও অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতা অভিবাসন ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশন মালয়েশীয় নিয়োগকর্তাদের কর্মী চাহিদাপত্র সত্যায়ন শুরু করেছে। ২৯ সেপ্টেম্বর একটি মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠানের ২৮ জন বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদাপত্র সত্যায়নের তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত সরকার চূড়ান্ত নিয়োগপদ্ধতি, কর্মীপ্রতি ব্যয় কিংবা যাত্রার সময়সূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি। সম্ভাব্য কর্মীদের তাই সরকারি নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত কোনো অর্থ প্রদান, স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা কারও কাছে পাসপোর্ট জমা না দিতে সতর্ক করেছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
ফলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও পুরোনো প্রশ্নগুলো এখনো রয়ে গেছে—নিয়োগের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, একজন কর্মীকে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা দিতে হবে এবং প্রতারণা বা অনিয়ম হলে দায় নেবে কে? –
তিন দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু শ্রমবাজার পুনরায় চালু করাই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজন স্বচ্ছ নিয়োগপদ্ধতি, নির্ধারিত ও বাস্তবসম্মত অভিবাসন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার। নতুন ব্যবস্থার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে এসব নিশ্চয়তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।




