মোহাম্মদ ইউনুছ অভি, টেকনাফ : শাহপরীর দ্বীপের মানুষের জীবনে বর্ষা মানেই নতুন আতঙ্ক। নাফ নদী আর বঙ্গোপসাগরের ঢেউ কখন কেড়ে নেয় ঘর, জমি কিংবা জীবিকার শেষ সম্বল—এই অনিশ্চয়তা নিয়েই কাটে তাঁদের দিন। রাতে ঢেউয়ের শব্দে ঘুম ভাঙে, সকালে ঘরটি টিকে থাকবে কি না, সেই দুশ্চিন্তায় শুরু হয় নতুন দিন।
সাগর ও নাফ নদীর মাঝখানে ৩২ দশমিক ৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শাহপরীর দ্বীপে ১৩টি গ্রামে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদী-সাগরের ভাঙনে দেড় হাজারের বেশি ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। তাঁদের অনেকে টেকনাফ, উখিয়া, কুতুপালংসহ বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। তবে এখনও শত শত পরিবার ঝুঁকি নিয়ে নদী ও সাগরের পাড়ে বসবাস করছে।
দুই পাশে জল, মাঝখানে জীবন
নাফ নদীর পাড়ে জিও ব্যাগের ওপর বসে ছেলের ফেরার অপেক্ষা করছিলেন বিধবা মোস্তফা খাতুন। পাশে ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন রেহেনা বেগম।
মোস্তফা খাতুন বলেন, ‘৩০ বছর ধরে নদীর পাড়ে জীবনযুদ্ধ করছি। কত ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস গেছে, তবু বেঁচে আছি। ছেলে নদীতে মাছ ধরতে গেছে। আকাশে কালো মেঘ দেখলেই বুক কেঁপে ওঠে।’
তিনি বলেন, ‘শাহপরীর দ্বীপের এক পাশে নাফ নদী, অন্য পাশে সাগর। দুই দিকের ঢেউয়ের মাঝেই আমাদের জীবন। বর্ষা আর ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রতিটি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটে।’
নাফ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরে ভাসমান মাছ ধরার নৌকার দিকে তাকিয়ে ছিলেন সখিনা খাতুন। নৌকাগুলোর আশপাশেই একসময় ছিল তাঁর বসতভিটা, প্রতিবেশীদের ঘরবাড়ি আর শিশুদের কোলাহলে মুখর একটি জনপদ। এখন সেখানে শুধু নদীর ঢেউ।
শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়ার বাসিন্দা সখিনা খাতুন (৪০) বলেন, ‘ওই যে নৌকাগুলো দেখছেন, ঠিক সেখানেই একসময় প্রায় ৩০০ পরিবারের একটি পাড়া ছিল। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট আর মানুষের কোলাহলে জায়গাটি মুখর থাকত। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে সেই পাড়া নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে ভাঙন আর থামেনি।’
সখিনা জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি ভাঙনের সঙ্গে লড়ছেন। এর মধ্যে পাঁচবার বসতি হারিয়েছেন। তবু শাহপরীর দ্বীপ ছেড়ে যেতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, ‘যাওয়ার মতো অন্য কোনো জায়গা নেই। তাই ভাঙনের ভয় নিয়েই প্রতিদিন বেঁচে থাকার যুদ্ধ করছি।’
একই অভিজ্ঞতা আবুল কালামের। বর্তমানে নাফ নদীঘেঁষা বেড়িবাঁধের পাশে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। নদীর দিকে তাকিয়ে আবুল কালাম বলেন, ‘একসময় ওই জায়গাতেই আমার বাড়ি ছিল। নদীর ভাঙনে সব হারিয়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছি। পরিবার নিয়ে আর কতদিন টিকে থাকতে পারব, জানি না। প্রতিদিনই অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে।’
ঘর হারানোর সঙ্গে হারিয়েছে জীবিকাও
ভাঙনে শুধু ঘরবাড়িই হারাননি শাহপরীর দ্বীপের মানুষ, হারিয়েছেন জমি ও জীবিকার উৎসও। দ্বীপের বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ মাছ ধরা ও কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বসতভিটা ও আবাদি জমি নদী-সাগরে বিলীন হওয়ায় অনেকেই এখন কর্মহীন।
ডেইলপাড়ায় আশ্রয় নেওয়া আব্দুল আমিন বলেন, ‘দ্বীপে থাকতে আধা ঘণ্টা মাছ ধরেই চার-পাঁচ শ টাকা আয় হতো। এখন সেই সুযোগ নেই। ঘরবাড়ি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে জীবিকাও হারিয়েছি। অনেক কষ্টে সংসার চলছে।’
সমুদ্রভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে কুতুপালং এলাকার পাশে আশ্রয় নিয়েছেন মনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, ‘সব হারিয়ে বাধ্য হয়ে এখানে চলে আসি। পরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প গড়ে ওঠে। নতুন জায়গায় থেকেও আগের জীবন আর ফিরে পাইনি।’
সাগরভাঙনের শিকার সাবেক ইউপি সদস্য নুরুল আমিনের জীবনেও একই গল্প। ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। একসময় তাঁর আট একর আবাদি জমি ছিল। এখন সেই জমি নেই, নেই নিজের ভিটাও।
নুরুল আমিন বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের দুটি পাড়া সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় ৩০০ পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। অনেকেই নিঃস্ব হয়ে অন্যত্র চলে গেছে। আমার নিজের ভিটেমাটি আর আট একর চাষের জমিও সাগরে তলিয়ে গেছে। একসময় মানুষের প্রতিনিধি ছিলাম, আজ আমি সর্বহারা।’
১০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য, সাবরাং ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে শাহপরীর দ্বীপের ১৩টি গ্রামে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। গত এক দশকে ভাঙনের কারণে প্রায় ১০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
তাঁদের অনেকে টেকনাফ পৌরসভা, ছোট হাবিরপাড়া, মহেশখালীয়াপাড়া, ডেইলপাড়া, সাবরাং, নয়াপাড়া, হ্নীলা এবং উখিয়ার পালংখালী, কুতুপালংসহ বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে নদী ও সাগরভাঙনে দেড় থেকে দুই হাজারের বেশি পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। বিশেষ করে ২০১২ সালে পশ্চিম পাশের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর পশ্চিমপাড়া, জালিয়াপাড়া ও মাঝপাড়ার বড় অংশ সাগরে বিলীন হয়ে যায়। এরপর বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে উখিয়া ও আশপাশের এলাকায় চলে যায়।
শাহপরীর দ্বীপের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুস সালাম বলেন, তাঁর ওয়ার্ডে এখনও প্রায় ৫০০ মানুষ নদীর পাড়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। এরই মধ্যে প্রায় ৩০০ ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে দ্রুত সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষা
শাহপরীর দ্বীপের পূর্বে নাফ নদী আর পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দ্বীপটি দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা। বর্ষা এলেই জোয়ারের পানির চাপ ও ভাঙনের আশঙ্কা বেড়ে যায়। ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু সাময়িকভাবে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের পাশাপাশি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, শাহপরীর দ্বীপের নদী ও সাগরপাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শাহপরীর দ্বীপের মানুষের কাছে নাফ নদী আর সাগর যেমন জীবিকার উৎস, তেমনি আতঙ্কেরও নাম। মাছ ধরতে গিয়ে এই জলেই জীবিকা খোঁজেন তাঁরা; আবার সেই জলই একের পর এক কেড়ে নেয় তাঁদের ঘরবাড়ি ও জমি। তাই নাফের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা যেমন গভীর, তেমনি তার ঢেউয়ের ভয়ও তীব্র। নিরাপদ আশ্রয় ও স্থায়ী ভাঙনরোধী ব্যবস্থা না হলে এই জনপদের মানুষের সেই অনিশ্চয়তা কবে শেষ হবে, তার উত্তর এখনো অজানা।




